[ বিপু ভাইয়া সিরিজ ]
ভয়াল রাতের হাতছানি
জু বা য়ে র হু সা ই ন
জু বা য়ে র হু সা ই ন
ওর নাম শামসুল আলম। তবে আলম নামেই বেশি পরিচিত। আমাদের দেশের একটা রীতি হচ্ছে কাউকে তার পূর্ণ নামে না ডেকে একটা ছোট নামে ডাকা। অন্যান্য দেশেও সম্্ভবত একই পদ্ধতি প্রচলিত। যাই হোক, এই ছোট নামে ডাকার কারণেই মানুষের ডাক নামের সৃষ্টি হয়েছে।
আলম নবম শ্রেণীর ছাত্র। লেখাপড়ায় মোটামুটি। মুক্তেশ্বরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ও। পরিবারের সদস্য ৪ জন। মা ইন্তেôকাল করেছেন ছয় বছর আগে। বাবা সাইদুল করিম মুক্তেশ্বরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিড়্গক। এছাড়া আলমের বড় বোন নাদিরা ইয়াসমিন ও তার একমাত্র সন্তôান রাহাত ওদের সঙ্গে থাকে। স্বামীর দাবি পূরণ করতে না পারায় অপমান ও লাঞ্ছনার ঝুড়ি ভরাট করে স্বামীর ঘর থেকে নাদিরাকে ‘চিরবিদায়’ নিতে হয়েছে। নাদিরাকে যখন এক প্রকার তাড়িয়ে দেয়া হয়, তখন ও সন্তôান-সম্্ভবা।
সাইদুল করিম সাহেব ‘কেস’ করেছিলেন। নিয়াজ মুহাম্মদকে ধরাও হয়। কিন্তু ধরার ৭ দিন পরই সে বেকসুর খালাস পেয়ে যায় কী এক অজ্ঞাত কারণে। সাইদুল করিম কিংবা নাদিরা ইয়াসমিন আর এগাননি। এর দেড় মাস পর রাহাতের জন্ম হয়।
বিজন, আলমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দু’জনে একসাথে স্ড়্গুলে যাওয়া-আসা করে। ওদের মধ্যে খুব ভাব।
ওরা স্ড়্গুলের পথে রওনা হওয়ার একটু পর সাইদুল করিম সাহেব রওনা হন। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। যাকে বলে ‘রম্নটিন মাফিক কর্মসাধন’।
থার্ড পিরিয়ডে সাইদুল করিম সাহেবের একটা ক্লাস ছিল নাইন-বি-তে। এই ক্লাসের সহকারী ক্লাস ক্যাপ্টেন শামসুল আলম। ক্যাপ্টেন বিল্টু আজ আসেনি। সঙ্গত কারণেই ক্লাসে আজ শৃঙ্খলা রড়্গার দায়িত্ব আলমের।
শিড়্গক লাউঞ্জে ঢোকার মুখেই প্রধান শিড়্গকের কড়্গ। আলম শিড়্গক লাউঞ্জে ঢোকার মুহূর্তে প্রধান শিড়্গক তাকে নিজের কড়্গে ডেকে নিলেন। আলম প্রধান শিড়্গকের সামনে কখনোই স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারে না। তার কী এক প্রবল ব্যক্তিত্ব ওকে সঙ্কোচে ফেলে দেয়। অন্যদের বেলায়ও কমবেশি এমনটি ঘটে।
‘কি, ছুটি নেবে?’ প্রধান শিড়্গকের জিজ্ঞাসা।
‘না স্যার’, আলমের জবাব। ‘আব্বুর একটা ক্লাস ছিল আমাদের সাথে। কিন্তু উনি এখনও যাননি। তাই ডাকতে এসেছি।’
‘ও, তুমি বুঝি জান না তোমার আব্বু আজ ছুটিতে?’
অবাক হল আলম। ভ্রূ-জোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, ‘আব্বু ছুটিতে? কিন্তু আমাকে তো কিছু বললেন না আসার সময়?’
‘হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন। তাছাড়া উনার শরীরটাও ইদানীং খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। আমি নিজেই ভাবছিলাম তাকে কিছুদিন ছুটি দেব। যাক, নিজেই ছুটি নিয়েছেন।’
‘কিন্তু স্যার, আলমের দ্বিধা তবু কাটে না।’ ‘প্রয়োজন হলে আব্বু তো আমার মাধ্যমেই দরখাস্তô পাঠান।’
‘হঁ্যা আমি তা জানি।’ বলে ড্রয়ার খুলে লম্বা ভাঁজ করা একটা কাগজ আলমের দিকে এগিয়ে দিলেন স্যার। বললেন, ‘এই যে দরখাস্তô। নিপুন এনেছে।’
আলম পড়ল।-বাড়ি থেকে বের হবার পরই মাথাটা ঘুরে ওঠে সাইদুল করিমের। বোঝা-ই যাচ্ছে কাঁপা কাঁপা হাতে সিগনেচার দেখে।
আলম বলল, ‘কিন্তু স্যার নিপুনের বাড়ি তো ওদিকে না।’
স্যার বললেন, ‘নিপুন আমাকে বলেছে সে স্ড়্গুলে আসছিল। একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল আজ তার। কিন্তু নাদিরাকে হন্তôদন্তô হয়ে ছুটে আসতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে নিপুনকে দরখাস্তôটা দিয়ে আমার কাছে পৌঁছে দিতে বলে। নিপুন সেমত দরখাস্তôটা আমাকে দেয়।’
আলমের মনটা খারাপ হয়ে গেল। স্যার বললেন, ‘মন খারাপ করো না আলম। সামান্য মাথা ঘোরা তো, একটু রেস্ট নিলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।----যাও ক্লাসে যাও। ছুটি দিতাম তোমাকে। কিন্তু সামনে ফাইনাল পরীড়্গা বলে দিচ্ছি না। তুমি যাও, আমি হারম্নন স্যারকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
আলমের মনটা মরে গেল। ও স্যারের শেষ কথাটা শুনতে পারেনি। তার আগেই ও প্রধান শিড়্গকের কড়্গ থেকে বেরিয়ে গেছে। ধীর পদড়্গেপে ক্লাসের দিকে চলল। ভাবতে লাগল, আব্বুর হঠাৎ এমন কি হল? সকালে তো ভালোই ছিলেন। এক সাথে পুকুরে গোসল করলাম।----
বাকি ক্লাসগুলোতে মন বসল না ওর। বিজনের সাথে ভালোভাবে কথাও পর্যন্তô বলল না। একটা অশুভ লড়্গণ ওর চোখেমুখে ফুটে উঠতে চাইছে। ছুটি হলে দ্রম্নত পায়ে বাড়ির পথ ধরলো।
বাড়িতে তখন কান্নার রোল উঠেছে। প্রতিবেশীরা বাড়ির উঠানে ভিড় করে রেখেছে। এবার আলমের মাথার মধ্যে অশুভ সঙ্কেতটা তীব্র শব্দ করে বেজে উঠলো। বেড়ে দ্রম্নত হল বুকের হার্টবিট।
‘কি হয়েছে?’ অস্ফুটেই ওর মুখ থেকে বাক্যটা বেরিয়ে এল।
জবাবে এক প্রতিবেশী বলল, ‘তোমার বাজানরে কারা জানি ছুরি মাইরা খুন করছে।’
হৃৎপিণ্ডটা দড়াম করে বুকের খাঁচায় আঘাত হানলো আলমের। যেন ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসবে যন্ত্রটা। হাত থেকে মাটিতে খসে পড়ল বই-খাতা। ‘কনে আব্বু?’ বলে ভিড় ঠেলে বারান্দায় উঠলো আলম। আরেকবার থমকে দাঁড়াল ও। বারান্দায় বিছানায় শোয়ানো ওর আব্বু। রক্তে ভেসে গেছে। বিছানা এবং শরীরের পোশাক লালচে রঙ ধারণ করেছে। হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো আলম। হাঁটু মুড়ে আব্বুর পাশে পড়ে গেল। একটু তফাতে নাদিরার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা চলছে। রাহাতকে আশপাশ কোথাও দেখা গেল না।
অনেকড়্গণ ধরে কাঁদল আলম। ধীরে ধীরে মাথা তুলল তারপর। চোখের পানিতে ভেসে গেছে নাক-মুখ-বুক। চোখ দু’টো জবা ফুলের মত লাল টকটক করছে। ঠোঁট জোড়া কাঁপছে বেদনায়।
আব্বুর নিষ্পন্দন মুখপানে তাকিয়ে থাকলো কিছুড়্গণ এক দৃষ্টিতে। মুখটা কেমন যেন বিমর্ষ দেখাল। তবে ঠোঁটের কোণে যেন সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি লুকিয়ে আছে। আলমের পুরো শরীরটা একটু কেঁপে উঠলো। তারপর ‘আব্বু------!’ বলে ডুকরে কেঁদে উঠলো এবং জ্ঞান হারালো।
এই মাত্র নাদিরার জ্ঞান ফিরেছে। জ্ঞান ফিরতেই ফিরে এলো ভাইয়ের পাশে। এবং চিৎকার করে উঠে আবার জ্ঞান হারালো।
তখন সন্ধ্যা। শামসুল আলমকে খুবই চিন্তিôত দেখাচ্ছে। গ্রামের লোকজনের সহায়তায় কিছুটা ধাতস্থ হয়ে উঠেছে ও।
সাইদুল করিম সাহেবকে রাত ৯টা ১০ মিনিটে সরকারি গোরস্থানে দাফন করা হলো। আলম বাড়ি ফিরে শুনলো রাহাতের নিখোঁজ হওয়ার কথা। সাথে সাথে আশপাশ সম্্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজলো। রাত ১১টার দিকে ক্লান্তô-শ্রান্তô ও অবসন্ন দেহে বাড়ি ফিরল।
নাদিরার অবস্থা খুব একটা ভালো না। একে তো পিতৃশোকে সারাদিন কেঁদেছে; তার ওপর এড়্গণে পুত্রশোকে ভেঙে পড়লো সে। কাঁদছে সে।
সাইদুল করিম সাহেবকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কে বা কারা করেছে তা জানা যায়নি। সকালে গ্রামের কিছু লোক ঐ রাস্তôা দিয়ে শহরে যাচ্ছিল কাজ করতে। ভেকুটিয়া বাজার ছাড়িয়ে বাঁশবাগানের কাছে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় তারা। পথের মাঝে একটা লোক পড়ে আছে। রক্তের মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
তাকে চিনতে পেরে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসে তারা। তখনও তার প্রাণবায়ু বের হয়ে যায়নি। বারবার আলমের নাম করছিলেন তিনি। নাদিরা আব্বুকে দেখে ছুটে আসে। বারান্দায় বিছানায় শুইয়ে দিয়ে লোক পাঠায় রিকশা ডাকার জন্য। উদ্দেশ্য বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। রিকশা আসে ঠিকই, কিন্তু ততড়্গণে সব শেষ। এর আগে নাদিরা রাহাতকে এক রকম জোর করেই স্ড়্গুলে পাঠায় আলমকে খবর দিয়ে ডেকে আনার জন্য।
রাত সাড়ে ১১টা। নিকষ-কালো আঁধার চতুর্দিকে। এক হাত সামনের জিনিস স্পষ্ট দেখা যায় না। উঠানে পেয়ারা গাছে হেলান দিয়ে বসে আছে আলম। পেটে দানাপানি কিছুই পড়েনি। পাশের বাড়ির ফাতেমা চাচী ওকে খাওয়ানোর অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু ও খায়নি। খেতে ইচ্ছে করছে না প্রচণ্ড রাক্ষুসে ড়্গিধে পেটে থাকা সত্ত্বেও।
নাদিরা একেবারে চুপ মেরে গেছে। অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না।
আলম পুরো ব্যাপারটা নিয়ে একবার এলোমেলো ভাবল। তারপর নিজের অবস্থাটা চিন্তôা করলো। নিজেকে বড় একা ও অসহায় মনে হলো ওর। মাথার উপরের বিশাল বটবৃড়্গের ছায়াটা সরে গেছে এক নিমিষেই। তদস্থলে স্থান করে নিয়েছে গভীর কালো একটা পর্দা। ধীরে ধীরে সেটা প্রশস্তô ও গভীর হচ্ছে।
একটা ঝিঁঝি পোকা একটানা ডেকে চলেছে তার বিরক্তিকর সুরে। রাতটাকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলল রাতজাগা একটা পেঁঁচার কর্কশ ডাক। গাছের পাতা নড়ছে না একবিন্দু। গুমোট বাধা একটা থমথমে পরিবেশ। কোন কিছুর জন্য বুঝি প্রস্তুতি চলছে।
‘আ-----য়---! আ-------য়----!!’
চমকে উঠলো আলম। কে ডাকে অমন করে? নাকি মনের ভুল? কান পেতে রইলো আবার শোনার জন্য।
‘আ-----য়---! আ-------য়----!!’ আবার শোনা গেল গম্্ভীর সেই আহ্বান। উঠে দাঁড়াল আলম। কি এক আকর্ষণ যেন আছে ঐ আহ্বানে।
ভয়াল রাত যেন ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এগিয়ে চললো আলম মন্ত্রমুগ্ধের মত শব্দের উৎস লড়্গ্য করে।
দুই·‘তারপর কি হলো?’ জিজ্ঞেস করলো বিপস্নব।
একটানা কথা বলে দম নেয়ার জন্য একটু থেমেছিল আলম। তখন জিজ্ঞেস করলো বিপস্নব। বিপস্নব বিজনের খালাতো ভাই। বেড়াতে এসেছে বিজনদের বাড়ি। এসেই শুনেছে আলমের আব্বার অস্বাভাবিক মৃতুøর খবর। আর শুনেই চলে এসেছে আলমের সাথে কথা বলতে। রহস্যের গন্ধ পেয়েছে ও। তাই জেনে নিচ্ছে পুরো ঘটনাটা।
একটা পুকুর পাড়ে শিমুল গাছের নিচে দুর্বা ঘাসের উপর বসেছে তিনজনে।
‘নিঝুম রাত,’ আবার বলতে শুরম্ন করেছে আলম। ‘ঝিঁঝি’র ডাকও থেমে গেছে। পুরো ভেকুটিয়া গ্রামটা যেন নিঝুম পুরিতে পরিণত হয়েছে। কোন এক অদৃশ্য আকর্ষণে এগিয়ে চলেছি আমি। পশ্চিম দিক থেকে এসেছে শব্দটা-ডাকটা। আর অল্প একটু সামনেই মুক্তেশ্বরী নদী। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা আভাস এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে।
‘এগিয়ে চলেছি আমি। সামনে একটা বাঁশঝাড়। অন্ধকারে কেমন যেন দেখাচ্ছে বাঁশ গাছগুলোকে। যেন কোন রক্তপিপাসু প্রেতাত্মা তার অসংখ্য হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে শিকার ধরার উদ্দেশ্যে। গায়ের মধ্যে গুলিয়ে উঠলো আমার। কিন্তু তবুও একই গতিতে পা দু’টো এগিয়ে চললো। বরয় চলার গতি যেন ক্রমশঃ দ্রম্নততর হতে লাগলো। হঠাৎ কিসে হোঁচট খেলাম। মুখ থুবড়ে পড়ার মুহূর্তে তীক্ষ্ন কর্কশ কণ্ঠের একটা পেঁচার ডাক কানে গেল। এতড়্গণে ভয় লাগতে শুরম্ন করেছে। পেঁচার ডাক শুনে কলিজা শুকিয়ে গেল। বুকটা ধুকপুক করা শুরম্ন করে দিয়েছে। ‘ইয়া আলস্নাহ! মরে গেছি আমি!’-বিরবির করে বললাম। কিছুড়্গণ ওভাবেই পড়ে রইলাম। তারপর যখন শিওর হলাম আমি ঠিকই আছি, তখনই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। হাত দিয়ে গায়ের ধুলো ঝারলাম। আমি যখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছি এবং সামনে তাকিয়েছি, ঠিক তখনই আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল তীব্র আলোর বন্যায়- যেন কোন সার্চ লাইট তাক করা হয়েছে আমার দিকে। ভীত-বিহ্বল হয়ে গেলাম আমি-কি খরব বুঝতে পারলাম না।
‘আ-----য়---! আ-------য়----!!’ আবার শোনা গেল সেই ডাক। তবে আগের চেয়ে আরো স্পষ্ট, ভরাট ও পুরম্নকণ্ঠ। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো আমার। চোখে শুরম্ন হয়েছে তীব্র জ্বালা। এমনিতেই বুজে গেল ওদু’টো। কানে আসছে হাসির শব্দ। বিশ্রী ও ভয়ঙ্কর সে হাসি। যেন কাঠফাটা রোদের মধ্যে ঠা-ঠা করে কাঠ ফাড়ছে কেউ। মনে হলো দেহের সব রক্তকণিকাগুলো অসাড় হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ! হঠাৎ তুমুল বর্ষা শুরম্ন হলো। ভিজছি আমি, কিন্তু কোন হুঁশই যেন নেই আমার। শীত শীত লাগতেই চোখ মেললাম। প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেলাম যেন। চারদিকে অন্ধকার। সেই সাথে মেঘের গর্জন ও বৃষ্টির একটানা শব্দ। মাঝে মাঝে আকাশ বিদীর্ণ করে বিদুøতের ছুটে চলা।
‘কানের কাছে কে যেন বলে উঠলো ‘পালাও!’ মনে হল নদীর দিক থেকে গাছপালা ভেঙ্গে কিছু একটা ছুটে আসছে। দৌড়াতে শুরম্ন করলাম আমি পেছন দিকে। হোঁচট খেয়ে পড়েও গেলাম কয়েকবার। কিন্তু হাচড়ে-পাচড়ে উঠে আবারও দৌঁড়। বাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসে কিসের সাথে ধাক্কা খেলাম। জ্ঞান হারাতে গিয়েও প্রবল ঝাকুনিতে পুরো সজাগ হয়ে গেলাম। গলা চিরে বেরিয়ে এলো, কে কে? জবাব এলো, আমি নিপুন। তুমি কনে গিইলে? এভাবে দৌঁড়াচ্ছিলে ক্যান? কিন্তু প্রবল মানসিক চাপ আর ক্ষুধার্ত নার্ভগুলো আর কাজ করলো না। আমি জ্ঞান হারিয়ে তার গায়ের উপর পড়ে গেলাম।’
থামলো আলম দম নেয়ার জন্য। ও থামলেও বেশ কিছুড়্গণ কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। শেষে নীরবতা ভাঙলো বিপস্নব। বলল, ‘হু! ভেরি ইন্টারেস্টিং এন্ড অলসো এক্সাইটিং।’
আলম দু’হাতে মাথা চেপে ধরে কি যেন ভাবছিল। তারপর হঠাৎ বিপস্নবের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের তুমি বাঁচাও বিপু ভাইয়া। ভয়াল রাতের ওই হাতছানি আমি আর শুনতে চাই না!’
ঝট করে ওর দিকে তাকাল বিপস্নব। বলল, ‘কি বললে? ভয়াল রাতের হাতছানি?’
বিজন বলল, ‘হঁ্যা, আলম ওই ডাকের নাম দিয়েছে ‘ভয়াল রাতের হাতছানি’।
‘ও আচ্ছা।’ বলল বিপস্নব। একটু ভাবল। তারপর আবার বলল, ‘আচ্ছা আলম, এ পর্যন্তô কতবার তুমি ওই ডাক শুনতে পেয়েছ? সব সময় কি গভীর রাতেই শুনতে পাও? তুমি একা শোনো না আরো কেউ শুনতে পায়?
আলম ধীরে ধীরে মাথা তুলল। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে ও এখন। বলল, ‘সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না। দুই-তিন রাত বোধহয় বাদ গেছে। মানে ছয়-সাত বার হবে।’
‘প্রতিবারই কি ছুটে গেছ?’
‘হঁ্যা, প্রতিবারই ছুটে গেছি।’ মাথা নেড়ে বলল আলম।
‘কেন ছুটে গেছ?’
‘তাতো জানি না। ওই ডাক শুনলেই আমার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে।’
‘আচ্ছা এমনকি কখনও হয়েছে যে তোমার সাথে সাথে অন্য কেউ ছুটে গেছে কিংবা কেউ তোমার আগেই চলে গেছে?’
আলম এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লো।
বিপস্নব বলল, ‘প্রতিবারই কি ওই বাঁশঝাড়ের ওখানে থেমে যাও?’
‘হঁ্যা। ওখানে পৌঁছলেই চোখে তীব্র আলো এসে পড়ে। তারপর তীক্ষ্ন হাসি। আমি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে আসি।’
‘কখনও দিনের বেলা ওদিকে গিয়েছ?’
‘না, আমার ভয় করে।’
বিজন বলল, ‘আমি গিয়েছি।’
বিপস্নব বলল, ‘কি দেখেছ?’
‘কি দেখেছি মানে? বাঁশঝাড়ের ওপাশে একটা রাস্তôা। রাস্তôার ওপাশে কিছু ঢালু জমি, তারপর নদী।’
‘ও।’ থেমে গেল বিপস্নব। যেন আর কিছু বলার বা জানার নেই।
আলম হঠাৎ বিপস্নবের দু’হাত জড়িয়ে ধরলো। অনুরোধের সুরে বলল, ‘তুমি চলে যাও বিপু ভাইয়া। আজই তুমি বাড়ি চলে যাও!’
বিপস্নব অবাক হলো। জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু কেন আমি চলে যাব? এইতো একটু আগেই তুমি আমাকে বললে, ‘ভয়াল রাতের হাতছানি’ থেকে তোমাকে বাঁচাতে।’
‘আমার খুবই ভয় করছে।’ বলল আলম। ‘আমার মন বলছে এই গ্রামে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’
‘যা ঘটার তাতো ঘটেই গেছে। তোমার আব্বু খুন হয়েছে।’
‘না বিপু ভাইয়া। আমি বুঝতে পারছি ভয়ঙ্কর কিছু একটা এখনও ঘটার বাকি আছে।’
‘ওটা তোমার দুর্বল মনের জল্পনা।’
‘হতে পারে, কিন্তু তোমার জীবন অত্যন্তô মূল্যবান। আর আমার আব্বু তো সামান্য একজন স্ড়্গুল শিড়্গক ছিলেন।’
‘তার মানে তুমি বলতে চাইছো ওই ভয়ঙ্কর ডাকের সাথে তোমার আব্বুর খুনের সম্পর্ক আছে?’
‘জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না।’ বলে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো আলম।
বিপস্নব দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। আনমনে ঘাসের একটা ডগা নখ দিয়ে কাটতে লাগলো।
বিজন পুকুরের পানিতে একটা ঢিল ছুড়ে দিয়ে তৈরি হওয়া ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
বিপস্নব উঠে একটু পায়চারি করলো। তারপর আলমকে ধরে উঠলো। আলম ততড়্গণে কিছুটা শান্তô হয়েছে। ওকে খুব সতেজ লাগছে। আব্বা মারা যাবার পর বোধহয় এই প্রথম কাঁদলো। ভাবল বিপস্নব। যাক, ভালোই হয়েছে। মনের ভাব কিছুটা কমছে এতে।
আলম বলল, ‘আমাকে ড়্গমা করো বিপু ভাইয়া। আসলে আমি খুবই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম।’
বিপস্নব বলল, ‘আমি তোমার অবস্থাটা বুঝতে পেরেছি আলম। তুমি কিছু চিন্তôা করো না। এর মধ্যে যদি কোন রহস্য থেকেই থাকে, তবে সে রহস্যের জাল আমি ছিঁড়বোই। মনে রেখো, বিপু যখন কোন ব্যাপারে একবার নাক গলায়, তখন এর শেষ না দেখে থামে না।’
‘আমি বিজনের কাছে তোমার ব্যাপারে অনেক শুনেছি।’ বলল আলম। তুমি যে বেশ বড় মাপের একজন ডিটেকটিভ, তা আমি জানি।’
‘ও বোধহয় একটু বাড়িয়েই বলেছে তোমাকে। যাকগে, এখন আবার একটু পেছনে ফিরতে চাচ্ছি আমি। সেদিন জ্ঞান হারানোর পর কি ঘটলো?’
‘আর কী ঘটবে? নিপুন আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিল। সেই রাতেই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। স্বপ্ন দেখলাম। জ্বরের কারণেই দুই-তিনদিন কোন ডাক শোনা গেছে কিনা বলতে পারবো না। আর স্বপ্নে কি দেখলাম শুনবে? দেখলাম, আব্বু এসে আমাকে বলছে, ‘খোকা, তুই আমার খুনের বদলা নিবি না? তুই ওদের ছেড়ে দিবি?’ হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতো। বলত, ‘আমাকে তুই মাফ করে দে খোকা। আমি তোর জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। শয়তানরা আমাকে সে সুযোগ দিল না।’ আরও দেখলাম রাহাতকে কারা যেন আটকে রেখেছে। ও খুব কাঁদছে ওর আম্মুর কাছে আসার জন্য। কিন্তু কিছুতেই আসতে পারছে না।’ আলমের চোখ দু’টো আবারও টলমল করে উঠলো।
বিপস্নব ওকে সান্তô্বনা দিয়ে বলল, ‘তোমাকে শক্ত হতে হবে আলম। তুমি যদি ভেঙে পড়ো তাহলে চিন্তôা করো তোমার বোনের অবস্থাটা। রাহাত এখনও নিখোঁজ রয়েছে। আমরা এখনও জানি না তার কি হয়েছে। আমি বিজনের মুখে তোমার সম্বন্ধে সবই জেনেছি। তোমাদের মত ছেলেরাই এদেশের ভবিষ্যৎ। মনে কর এটা তোমার একটা পরীড়্গা। এ পরীড়্গায় তোমাকে পাস করতেই হবে। কেবল পাস মার্ক নিয়ে পাস করলে হবে না, অ+ পেতে হবে তোমাকে। মনে রাখবে, সাহসী মানুষেরা কোন দিন ভেঙে পড়ে না। কোন পরাজয়কেই তারা পরাজয় বলে মনে করে না। বরং সেখান থেকে শুরম্ন হয় তাদের বিজয়।’
আলমের চোখের কোণে অশ্রম্ন শুকিয়ে গেছে। মুগ্ধ হয়ে গেছে ও বিপস্নবের কথায়। তাইতো, এমন কথা তো আগে কেউ ওকে শোনায়নি।
বিজনও মুগ্ধ, বরং চমৎকৃত বিপস্নবের কথায়।
সন্ধ্যার আভা তখন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। একঝাঁক পাখি উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে কিচিরমিচির রব তুলে। ভেসে এলো মাগরিবের আজান।
বিপস্নব বলল, ‘চলো যাওয়া যাক। কাল সকাল থেকেই আমাদের অভিযান শুরম্ন হবে ইনশাআলস্নাহ।’
চলতে শুরম্ন করল ওরা। এদিকে পৃথিবী ডুবে গেল আরেকটি প্রভাতের আশায়।
তিন·পরের দিনটি ঘুরে ফিরেই কাটালো বিপস্নবরা।
গ্রামের মোটামুটি দর্শনীয় স্থানগুলো বিপস্নবের দেখা হয়ে গেল।
মাঠ ভরা সবুজ কচি ধান। ধানের আইল দিয়ে হাঁটল। ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাছরাঙা, বক আর চ্যাগা পাখি উড়ে পালাল। একটা গুঁইসাপ দেখে আরেকটু হলে বিপস্নব তো পড়েই যাচ্ছিল ড়্গেতের মধ্যে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে একটা খরগোশ। ধান ভূঁই থেকে উঠে কেবল একটা কাশের ভূঁই-এর মধ্য দিয়ে পায়ে চলা একটা পথ দিয়ে হাঁটছিল ওরা। এই সময় দেখা দিল খরগোশটা। সবাই মিলে তাড়া করল। ধরা অবশ্য উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু হঠাৎ কোথায় যে লুকালো ওটা, ওরা বুঝতে পারল না।
রংবেরঙের পাখি, ফুল আর মনকাড়া সব দৃশ্য দেখে বিপস্নবের মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। ইচ্ছে হল প্রজাপতির মত দু’টি ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে। ফুলে ফুলে গিয়ে ওদের ঘুম ভাঙাতে আর মধু সংগ্রহ করতে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো আর সব কিছু পূরণ করা যায় না। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। এ সব কিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষেরই জন্য।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে কখন যেন দুপুর হয়ে গেল। প্রচণ্ড ড়্গিধে পেয়েছে সবারই। পেটের মধ্যে যেন কয়েকটা করে ছুঁচো নাচানাচি শুরম্ন করে দিয়েছে।
আলমের আজ বিজনদের বাড়ি খাওয়ার কথা দুপুরে। নামাজ-খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়েই বিকেলের আগে আগে আবার বেরিয়ে পড়লো ওরা।
গ্রামের লোকেরা সত্যিই খুব অতিথিপরায়ণ-বিপস্নব তা নিজেই বুঝতে পারলো। সবাই হাসি মুখে আলাপ করলো ওর সাথে। অনেকে কিছু খেতেও দিল যার অধিকাংশই নিজেদের গাছের বা ঘরে বানানো।
আলমের আব্বার জন্য অনেকে সমবেদনাও জানালো।
গ্রামটা মুহূর্তে ভালো লেগে গেল বিপস্নবের।
মুক্তেশ্বরী নদীটা ভেকুটিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে। এখন প্রায় শুকনো। তবে যেটুকু এখনো পানি আছে, তাতে দু’একটা জেলে নৌকা ও ডিঙি নিয়ে চলাচল করে। এমনই একটা ডিঙিতে চড়ে বসল ওরা। বিপস্নবের অনেক দিনের শখ নদীতে নৌকা বাইবে ও আর ভাটিয়ালি গান গাবে, যদিও গলা তত ভালো না। আজ সুযোগ পেয়ে তার সদ্ব্যবহার করল। গান অবশ্য বিজনই গাইল।
বিজন ও আলম বিপস্নবকে দেখিয়ে দিল কিভাবে বৈঠা চালাতে হয়। নৌকার গতি চেঞ্জ করতে হলে কোন দিকে বৈঠা দিয়ে জোরে পানিতে আঘাত করতে হয় তা অল্প সময়েই ও রপ্ত করে নিল।
পুরোপুরি বিকাল না হলেও বাতাস বেশ কোমল। রোদের ঝাঁঝ একেবারে নেই বললেই চলে। নদীর উভয় তীরে এই সময়ও অনেকে গোসলসহ অন্যান্য কাজ করছে। এক পাশে একটু জংলা মত দেখা গেল। সেখানে হাঁসদের অবাধ বিচরণ।
বিজন তার দরাজ কণ্ঠে গান ধরেছে-
নোঙর ছাড়িয়া নায়ের দেরে দে মাঝি ভাই
বাদাম উড়াইয়া নায়ের দেরে দে মাঝি ভাই-----
এভাবে কত সময় কাটল তা কেউ জানে না। শরীরগুলোও ক্রমে ক্লান্তিôতে নুয়ে পড়তে লাগল। এই সময় আলম বলল, ‘চলো এবার ফেরা যাক।’
‘এখনই ফিরব?’ বিপস্নব অনিচ্ছা প্রকাশ করল।
‘সন্ধ্যা তো হয়ে এলো,’ বিজন বলল। ‘দেরি করলে আম্মু বকা দেবে।’
‘ঠিক আছে চলো।’
ডিঙি তীরে ভিড়ল। নেমে পড়ল ওরা নোঙর করে।
নদীর ঢালু অংশ যেখান থেকে শুরম্ন হয়েছে, এদিকে সেখানে একটু ডুমুর গাছ ডালপালা বিস্তôার করে দাঁড়িয়ে সগৌরবে নিজের অস্তিôত্ব ঘোষণা করছে। সেদিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো বিজন। তা দৃষ্টি এড়ালো না বিপস্নবের। জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল? অমন চমকে উঠলে যে?’
‘নিপুন!’ অস্ফুটে উচ্চারণ করল বিজন।
‘নিপুন?’ বলল আলম।
‘হঁ্যা, ওই ডুমুর গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে নজর রাখছিল।’

‘কুইক! ওকে ধরতে হবে।’ বলেই ছুটতে শুরম্ন করল বিপস্নব। ছুটল বিজন এবং আলমও।
ওরা যখন ডুমুর গাছটার নিচে পৌঁছল, তখন নিপুনের ছায়াও দেখতে পেল না। পালিয়েছে।
এদিকে-ওদিকে খুঁজল ওরা। না নেই।
‘ব্যাটা পালিয়েছে!’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল আলম।
‘কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি পালাবে কোথায়?’ একটু ভাবল বিপস্নব। হাঁপাচ্ছে ও-ও। একটু পর বলল, ‘বিজন তুমি শিওর ও নিপুনই ছিল?’
বিজন আমতা আমতা করতে লাগলো, ‘আমার তো তা-ই মনে হল।’
‘হুঁ। ও যদি নিপুনই হয় তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের দিকে নজর রাখছিল। নইলে এভাবে পালাত না।’ বিপস্নবের মাথার মধ্যে দ্রম্নত ভাবনা চলেছে। নিজেকেই ধমকালো ও। বলল, ‘ইশ্! আগে কেন নিপুনের কথা আমার মনে এলো না? ওকে জিজ্ঞেস করলেই তো আলমের বাবার খুনের অনেক কিছু জানা যেত।’
‘তাই তো!’ বিজনও যেন বুঝতে পারল ব্যাপারটা।
আলমও সায় দিল। বলল, ‘চলো, আজই ওদের বাড়িতে যাই।’
‘হঁ্যা চলো,’ বলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল বিপস্নব। হঠাৎ আবার দাঁড়িয়ে গেল ও। বলল, ‘এক মিনিট।’
উবু হয়ে মাটি থেকে এক টুকরো কাগজ উঠিয়ে নিল বিপস্নব। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বিকেলের শেষ আলোয় চোখের সামনে মেলে ধরে চিরকুটটা শব্দ করে পড়লো বিপস্নব।
আজিম ভিলা। নেক্সট নাইট। রাত দশটা।
ওর পড়া বাতাসেও মিলিয়ে যায়নি, এই সময় নিঃশব্দে একটা বাইসাইকেল এসে ওদের পাশে থামল। থেমেই বেল বাজাল। চমকে উঠল সবাই।
‘চাচা আপনি (!)?’ বলে উঠলো আলম।
পায়ের ওপর ভর রেখে সাইকেলের সিটেই বসে আছেন মাঝারি বয়সের লোকটা। মোটামুটি মার্জিত চেহারা। তবে অত্যধিক পরিশ্রমে কপালে দু’টো স্পষ্ট ভাঁজ পড়েছে। ঘেমে গেছেন তিনি। ঘামে সমস্তô মুখমণ্ডল চকচক করছে। পকেট থেকে রম্নমাল বের করে ঘাম মুছলেন ধীরে সুস্থে। বললেন, ‘হঁ্যা আমি। কেমন আছ তুমি আলম?’
বিপস্নবের মনে হল যেন লোকটা ঠাট্টা করছে। নাহলে এই অবস্থায় এই ধরনের প্রশ্ন কেউ জিজ্ঞেস করে। ওর চোখ আটকে রইলো লোকটার পায়ের কাছে আরেকটা কাগজের ওপর।
আলম বলল, ‘আমি ভালো আছি। কিন্তু আপা খুবই ভেঙে পড়েছে।’
‘স্বাভাবিক।’ বললেন লোকটা। ‘রাহাতের কোন খবর পেয়েছ?’
আলম এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল।
লোকটা আলমের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। বিপস্নবদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা বুঝি আলমের বন্ধু?’
বিপস্নব কাগজটার দিক থেকে চোখ সরাতে না চাইলেও লোকটার দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে মাথা নাড়ল। লোকটা পকেট থেকে রম্নমাল বের করার সময় কাগজটা পড়েছে, খেয়াল করেছে বিপস্নব।
বিজনও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
চলো আলম, বাসায় যাই।’ বললেন লোকটা। হঠাৎ বিপস্নবের দৃষ্টি লড়্গ্য করে তার দৃষ্টিও গিয়ে পড়লো কাগজটার ওপর। তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে পকেটে ভরলেন। কিন্তু যা দেখার তা দেখা হয়ে গেছে বিপস্নব খানের। তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে না থাকলে এই স্বল্প আলোতে কাগজের লেখা পড়তে পারার কথা নয়।
মাথায় তখন কম্পিউটারের চিন্তôা চলেছে বিপস্নবের। দু’টো কাগজেই একই লেখা। এটা কি করে সম্্ভব? তাহলে নিপুনের সাথে আলমের এই চাচার সম্পর্ক আছে? কি সম্পর্ক? সাইদুল করিম সাহেব খুন হওয়ার সাথে কোন সম্পর্ক? নাকি ‘ভয়াল রাতের হাতছানি’র সাথে?
একটু বরং খুশিই হল বিপস্নব। একটা সূত্র তো পাওয়া গেছে। দেখা যাক কী হয়।
এই গ্রামে যেন সন্ধ্যার আঁধার অতি দ্রম্নত নেমে আসতে লাগলো।
চার·ফরিদুল ইসলাম মৃত সাইদুল করিম সাহেবের ফুফাতো ভাই। থাকেন হামিদপুরে। ভাইয়ের মৃতুøর খবর সেদিনই জেনেছেন তিনি। কিন্তু তখন না এসে আজ এসেছেন। নাদিরা ইয়াসমিন চাচাকে কাছে পেয়ে খুবই কাঁদল। প্রথম পর্যায়ে ফরিদুল ইসলাম কোন সান্তô্বনা তাকে দিতে পারলেন না। শেষে বললেন, ‘এখন আর কান্নাকাটি করে কি হবে মা মণি? আমি কিছুদিন তোদের এখানে আছি। দেখি কি করা যায়। আলস্নাহ নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।’
আলম বুঝতে পারল না চাচা কিসের ব্যবস্থার কথা বলছেন।
নাদিরা ইয়াসমিন বলল, ‘আমি কিছু শুনতে চাইনে চাচা, তুমি শুধু আমার রাহাতকে এনে দাও। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’
ফরিদুল ইসলাম বললেন, ‘আমি তো বললামই ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। তুই এখন একটু শান্তô হ। একটু শান্তô হ মা-মণি।’ তার চোখেও পানি টলমল করে উঠল। অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি একটু গ্রামটা ঘুরে আসছি।’ চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
আলম অবাক হল। চাচা এই সন্ধ্যা রাতে কোথায় গেলেন? নাকি গ্রাম দেখার নাম করে চোখের পানি লুকাতে চলে গেলেন? চাচা বোধহয় আব্বুকে অনেক ভালোবাসতেন। আসলে ফরিদ চাচা ওদের বাড়ি খুব কমই এসেছেন। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ওরাই গেছে চাচার বাড়ি। আলমের চোখ জোড়াও ছলছল করে উঠল।
* * *
সেদিন রাতে এশার নামাজের পর এক জায়গায় মিলিত হল আলম, বিজন ও বিপস্নব। বিষয় আর কিছু নয়, আজ সন্ধ্যার মুহূর্তে পাওয়া চিরকুট এবং আলমের ফরিদ চাচা।বিপস্নব জিজ্ঞেস করল, ‘এখন আমাকে আজিম ভিলা সম্পর্কে বলো।’
বিজন জবাব দিল, ‘ভেকুটিয়া গ্রামে পাকা বাড়ির সংখ্যা খুবই কম। তবে এখন বেশ কিছু পাকা বাড়ি তৈরি হয়েও গেছে। কিন্তু কোন বাড়ির নাম রাখা এখনও শুরম্ন হয়নি। হঁ্যা, আমার চোখে যতদূর পড়েছে লাইলী কটেজ, রোকেয়া ম্যানসন এরূপ কয়েকটা বাড়ির নাম আছে। তবে আজিম ভিলা নামে কোন বাড়ি আমার জানা মতে এদিকে নেই।’
আলম বলল, ‘বিজন ঠিকই বলেছে। আমার চোখেও ও নামে কোন বাড়ি পড়েনি।’
বিপস্নব নিচের ঠোঁটে দাঁত দিয়ে বার কয়েক চিমটি কাটল। বলল, ‘এমনও হতে পারে, এ নামে সত্যিই বাড়ি আছে কিন্তু তার নেমপেস্নট নেই। এটা ওদের সঙ্কেতও হতে পারে।’
অবাক হলো বিজন ও আলম।
বিজন বলল, ‘তুমি গোয়েন্দা তো, তাই অমন করে ভাবতে পারছ।’
‘হঁ্যা, সেটা একটা দিক।’ বলল বিপস্নব। ‘তবে তোমরা একটু গভীরভাবে চিন্তôা করলেও এছাড়া আর কোন যুক্তি খুঁজে পেতে না।’
‘তার মানে আমাদের ধরে নিতে হবে ‘আজিম ভিলা’ একটা সাঙ্কেতিক নাম?’ বলল আলম।
‘যেহেতু তোমরা বলছ বাড়িটাকে চেন না, কাজেই এছাড়া আর উপায় কি?’ বলল বিপস্নব।
বিজন বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু আমরা আজিম ভিলা নিয়ে এতো ভাবছি কেন?’
‘কারণ,’ বলল বিপস্নব। ‘এটাই এখন আমাদের কাছে একমাত্র সূত্র সামনে এগোনোর।’
একটু বিরতি দিল, তারপর আবার বলল, ‘আরেকটা সূত্রও অবশ্য আছে।’
আলম ও বিজন এক সাথে জিজ্ঞেস করল, ‘কী?’
বিপস্নব একটু রহস্যময়ভাবে হাসল। চমকে উঠল অন্যরা।
বিপস্নব বলল, ‘হঁ্যা আলম, তোমার চাচা, --না না, চমকে ওঠার প্রয়োজন নেই। আমি এখনও শিওর না। স্রেফ অনুমান আর কি।’
আলমের চমক কাটেনি। জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু ফরিদ চাচাকে তোমার কেন সন্দেহ হয়? তাছাড়া সে এলোই তো আজ বিকেলে!’
‘শোনো আলম,’ বুঝিয়ে বলল বিপস্নব। ‘গোয়েন্দাদের চোখে কোন জিনিসই ুদ্র নয়। জানোই তো কেঁচো খুঁড়তে অনেক সময় সাপ বেরিয়ে আসে। তোমরা লড়্গ্য করেছো কি-না আমি জানিনে, ফরিদুল ইসলাম সাহেব খুব ঘামছিলেন। ঘাম মোছার জন্য পকেট থেকে রম্নমাল বের করতে গিয়েই একটা চিরকুট মাটিতে পড়ে যায়। সেটা অবশ্য তিনি উঠিয়েও নেন।’
‘তো?’ আলমের জিজ্ঞাসা।
‘তোমরা জেনে আশ্চর্য হবে যে ঐ চিরকুটটাতেও অবিকল একই লেখা ছিল।’
‘তার মানে---’
‘না আলম, তার কোন মানে নেই। আমি আগেই বলেছি এটা আমার অনুমান। তাছাড়া আমি ভুলও দেখতে পারি। ঐ সময় আলোর যথেষ্ট স্বল্পতা ছিল। তবে আমাদের মূল লড়্গ্য এখন আমাদের কাছে যে চিরকুটটা আছে তার মালিককে খুঁজে বের করা।’ থামলো বিপস্নব।
বিপস্নব থামলেও কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। সুতরাং বিপস্নবই আবার বলল, ‘আচ্ছা, গ্রামের দড়্গিণ দিকে একটা পোড়োবাড়ি আছে না?’
আলম বলল, ‘হঁ্যা, ওটা আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরেই। কিন্তু তুমি সেটা জানলে কি করে? তুমি তো এখনও ওদিকে যাওনি।’
বিপস্নব কিছু না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগল। মানুষকে রহস্যের মধ্যে রেখে ও খুবই আনন্দ পায়।
জবাব না পেয়ে আলম নিজেই বলল, ‘বুঝেছি, এখানে আসার আগে তুমি ভেকুটিয়া সম্বন্ধে সব ইনফরমেশন নিয়েই তবে এসেছো। কি, ঠিক বলিনি?’
‘হঁ্যা,’ বলল বিপস্নব। ‘আমি চেষ্টা করেছি ভেকুটিয়া গ্রাম সম্বন্ধে যথাসম্্ভব জানার। এখন আমার আরও কিছু জানা এই মুহূর্তে খুবই প্রয়োজন।’
এতড়্গণ পর মুখ খুলল বিজন। বলল, ‘কী? আর কী জানতে চাও তুমি?’
বিপস্নব কোন জবাব দিল না। নীরবে ভাবল কিছু সময়। মনে মনে গুছিয়ে নিল কিভাবে শুরম্ন করবে। তারপর বলল, ‘এই গ্রামে ধনী লোকের বাস কেমন? আই মিন, কত ঘর ধনী লোক এখানে বাস করে?’
আলম বলল, একটু ভেবে, ‘তা প্রায় দশ-বারো ঘর হবে।’
‘ঠিক আছে, এখন বল, এদের মধ্যে হঠাৎ করে বড়লোক হয়েছে কত জন?’
জবাব দিল বিজন। বলল, ‘এ রকম দু’জনের কথাই বলা যায়। আলিনুর রহমান মলৈ আর চৌধুরী
মোঃ আজিম।’
হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল বিপস্নব। জিজ্ঞেস করল, ‘দ্বিতীয় নামটা কি বললে?’
‘চৌধুরী মোঃ আজিম।’ রিপিট করল বিজন।
‘চৌধুরী মোঃ আজিম, চৌধুরী মোঃ আজিম, ---’ কয়েকবার আওড়ালো বিপস্নব নামটা, যেন জ্যামিতির কোন উপপাদ্যের প্রমাণ মুখস্থ করল। জিজ্ঞেস করল, ‘এই লোক সম্পর্কে তোমরা কতটা জান?’
আলম জবাব না দিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আজিম ভিলার সাথে চৌধুরী মোঃ আজিমের সম্পর্ক খুঁজছ না-তো?’
‘হঁ্যা,’ বিপস্নব স্বীকার করে নিল। ‘এখন লোকটা সম্বন্ধে যতটা জান আমাকে বলো। দাড়ি, কমা কিছুই বাদ দেবে না।’
‘খুব বেশি তার সম্বন্ধে গ্রামের কম লোকেই জানে।’ বলতে শুরম্ন করল বিজন। ‘বছর দেড়েক মত আগে তিনি এই গ্রামে আসেন। এর আগে সম্্ভবত পার্বত্য এলাকায় ছিলেন। সম্্ভবত বললাম এই কারণে, আমি এটা লোকমুখে শুনেছি। এখানে জমি কিনে বাড়ি করেন তিনি। গ্রামে তার বাড়িটাই সবার আগে যে কারোর নজর কাড়ে। ইদানীং শোনা যাচ্ছে তিনি পোড়োবাড়িটাও কিনে নিয়েছেন বেশ কিছু জায়গাসহ।’ থামল বিজন।
বিজন থামতেই আলম শুরম্ন করল, ‘জায়গাটা অযথা পড়ে আছে। শোনা যাচ্ছে তিনি ওখানে একটা কারখানা করবেন। গ্রামের লোকেরা তো দারম্নণ খুশি। খুশি হবারই কথা। গ্রামে একটা কারখানা হলে কর্মসংস্থান বাড়বে। হোক না যে সে কারখানা।-----কিন্তু, এই বিপু ভাইয়া, তুমি হঠাৎ পোড়োবাড়ি সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলে কেন?’
‘এমনি।’ জবাব দিল বিপস্নব, ‘কৌতূহল হল, তাই।’
‘উঁহু, আমার তা বিশ্বাস হয় না। নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।’ বলল আলম।
বিজন বলল, ‘হঁ্যা বিপু, আমারও ধারণা তোমার এই সব জানতে চাওয়ার পেছনে কোন কারণ আছে। কী সে কারণ?’
অবশেষে মুখ খুলল বিপস্নব। বলল, ‘হঁ্যা, কারণ অবশ্যই একটা আছে। কিন্তু এখন নয়, সময় হলেই সব জানতে পারবে।’
চুপসে গেল আলম ও বিজন। বুঝতে পারল বিপস্নব নিজ ইচ্ছায় কিছু না বললে ওর কাছ থেকে কথা আদায় করা যাবে না। কাজেই ও সম্বন্ধে আর কোন প্রশ্ন করল না।
আলম বলল, ‘এখন আমাদের কী করণীয়?’
বিপস্নব বলল, ‘আমি এখনও শিওর না, তবে আমার মন বলছে ভেকুটিয়া গ্রামে বড় একটা কিছু ঘটছে। এবং সবার অগোচরেই সেটা ঘটছে। কিন্তু আমি এর শেষ না দেখে ছাড়ছিনে। শোনো আলম ও বিজন, আমার একটা বদ অভ্যাস আছে- কোন রহস্য আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলে, আই মিন কোন রহস্যের গন্ধ পেলে আমি সেটা উপেড়্গা করতে পারিনে। ভেকুটিয়ার রহস্যটা আমাকে হাতছানি দিয়েই ডাকছে।’
অবাক হয়েছে অন্য দু’জন। আলম জিজ্ঞেস করল, ‘এই বিপু ভাইয়া, তুমি ঠিক আছো তো? এমনভাবে কথা বলছো কেন?’
হাসল বিপস্নব। সে হাসির মধ্যেও রহস্য লুকিয়ে আছে। বলল, ‘সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সো সরি। চলো, ওঠা যাক। অনেক রাত হয়ে গেছে। তাছাড়া ফরিদ চাচা কোথায় কি করছেন তা দেখা দরকার।’
উঠতে যেয়েও থমকে গেল আলম। জিজ্ঞেস করল, ‘তার মানে?’
বিপস্নবের মাথায় তখন আলমের বাবার খুন, ‘ভয়াল রাতের হাতছানি’, চিরকুট, ফরিদুল ইসলাম, নিপুন, রাহাত, চৌধুরী মোঃ আজিম, আজিম ভিলা, পোড়োবাড়ি প্রভৃতি বিষয়গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। আলমের প্রশ্নের জবাবে গম্্ভীরভাবে বলল, ‘সেটা আগামীকাল রাত ১০টার পরেই জানা যাবে।’ বলে হাঁটতে শুরম্ন করল।
অন্ধকারে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল আলম এবং বিজন। তারপর বিপস্নবকে অনুসরণ করল।
পাঁচ·বিপস্নব মোটামুটি একটা পস্নান তৈরি করল এবং অন্যদেরকে তা বুঝিয়ে দিল। সে আর বিজন আগেই গিয়ে লুকিয়ে থাকবে পোড়োবাড়ির কোন এক জায়গায়। কোথায় লুকাবে তাও মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছে। আজ দিনের বেলা যতদূর সম্্ভব কারোর নজরে না পড়ে পোড়োবাড়ির আশপাশটা দেখে এসেছে ওরা। তাতে পস্নানটা তৈরি করতে বিপস্নবের সুবিধেই হয়েছে।
অনেকটা আন্দাজের ওপর ভিত্তি করেই পোড়োবাড়িটাকে টার্গেট করেছে বিপস্নব। এছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। যদি কিছু একটা আজ রাতে হয় তাহলে পোড়োবাড়িতেই সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে হতে পারে। চৌধুরী মোঃ আজিম চাইবেন না তার বসতবাড়িটা লোকের নজরে পড়ে যাক। তবে সবকিছু নির্ভর করছে চিরকুটে লেখা আজিম ভিলা এই ভেকুটিয়া গ্রামেই থাকার ওপর।
পস্নান অনুযায়ী আলম তাদের বাড়িতেই থাকবে। ফরিদ চাচার ওপর নজর রাখবে।
রাত নয়টা বাজতে না বাজতেই গুছিয়ে নিল বিপস্নব ও বিজন। একটা টর্চ এবং টুকিটাকি ছোটখাট কয়েকটা জিনিসপত্র শার্ট ও প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে রওনা দিল ওরা। আলম খেয়ে-দেয়ে নিজের রম্নমে গিয়ে ঢুকল। ফরিদ চাচা ঢুকলেন একটু পর। যে কয়দিন এখানে থাকবেন আলমের রম্নমেই থাকবেন তিনি।
নাদিরা ইয়াসমিন আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
‘কিরে আলম, তোর মন খারাপ?’ বিছানায় আলমের পাশে শুতে শুতে জিজ্ঞেস করলেন ফরিদ চাচা। ‘অত মন খারাপ করিস্নে তো। রাহাত খুব শিগগিরই ফিরে আসবে, আমি,--- তোকে কথা দিচ্ছি। এখন ঘুমা।---আর শোন্,---- না থাক, ঘুমা তুই।’
সোয়া নয়টা বাজে। আলম মনে মনে উত্তেজিত হয়ে উঠল। না জানি পোড়োবাড়িতে আজ রাত দশটায় কি ঘটবে যদি ওটাই চিরকুটের আজিম ভিলা হয়। তবে বিপু ভাইয়া যেহেতু বলেছে, তাই আজিম ভিলা ওটাই হবে। ছেলেটা খুব জিনিয়াস। মুহূর্তেই সকলকে আপন করে নিতে পারে। কথাবার্তা, চাল-চলন সবকিছুর মধ্যেই চমৎকার একটা আর্ট আছে ওর। আর যে কোন ঘটনা খুব সহজেই ব্যাখ্যা করে বুঝে নিতে পারে। বিপস্নবকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলল আলম।
খুবই অস্বস্তিô লাগছে আলমের। এলোমেলো অনেক কিছুই ভাবতে লাগল- ফরিদ চাচা কি সত্যিই এ সবের সাথে জড়িত? তাহলে এখন শুতে এলেন কেন? তার তো এখন আজিম ভিলায় যাওয়ার কথা। নাকি জেনে ফেলেছেন যে ওরা তাকে সন্দেহ করছে এবং আজ রাতে আজিম ভিলায় যাওয়ার সিদ্ধান্তô বদলেছেন? আচ্ছা, বিপু ভাইয়া কেন ফরিদ চাচাকে সন্দেহ করছে? ও তো তাকে আগে কখনও দেখেনি।--- কি ঘটবে আজ রাত দশটায়? ফরিদ চাচা বলছেন রাহাতকে খুব শিগগির পাওয়া যাবে, তিনিই ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু রাহাতের নিখোঁজ হওয়া সম্বন্ধে তার কি সম্পর্ক? তিনি কি জানেন রাহাত কোথায় আছে? কিভাবে জানেন? তাহলে তিনিই কি কোথাও আটকে রেখেছেন রাহাতকে? কেন? কী মতলব তার?----দূর! কী সব আবোলতাবোল ভাবছি আমি? আসলে আব্বুর হঠাৎ মৃতুø আর রাহাতের নিখোঁজ এবং ওই ডাক আমাকে বিশেষ করে আমার মগজে গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে।
‘এই আলম, আলম ঘুমিয়ে পড়েছিস্ নাকি?’ ফরিদ চাচা ডাকলেন আস্তেô করে। আলম জবাব দিল না। পাশ ফিরে শুলো। বোঝাতে চাইলো সে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখতে চায় এরপর ফরিদ চাচা কী করেন। আরও কিছু সময় পার হলো।
নানা চিন্তôা খেলে গেল আলমের মাথায়। সবকিছুই কেমন গোলমেলে লাগছে ওর কাছে। এলোমেলো ভাবনাগুলো ওকে অস্থির করে তুলছে। মৃদুভাবে ঘেমে চলেছে সমস্তô শরীর। শরীরের সমস্তô নার্ভ ঢিলা হয়ে গেল। তন্দ্রা এসে স্পর্শ করল ওর দু’চোখের পাতা। হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল আলম। মুহূর্তে সজাগ হয়ে গেল। কান দু’টো খাড়া হয়ে গেল। হালকা পায়ের শব্দ। দরোজা খোলার কঁ্যাচ্ কঁ্যাচ্ শব্দ হলো।
বিছানায় জমে গেছে যেন আলম। কি করবে তা ভেবে পাচ্ছে না।
বাম হাতটা দেহের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে অন্য পাশে ছোঁয়ালো। না, নেই ফরিদ চাচা। দ্রম্নত অথচ নিঃশব্দে পাশ ফিরলো ও। খোলা দরোজা দিয়ে চাঁদের আলো উঁকি দিচ্ছে।
নিঃশব্দে খাট হতে নামল আলম। পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে গায়ে একটা শার্ট চাপালো। তারপর দরোজার কাছে গিয়ে সাবধানে মাথা বের করে বাইরে উঁকি দিল। আকাশে রূপোলি চাঁদ জোছনা ছড়াচ্ছে। তাই ফরিদ চাচাকে দেখতে পেল। তিনি তখন উঠানের শেষ মাথায় পৌঁছে গেছেন। পেছনে আস্তেô করে দরোজা বন্দ করল আলম। বোনের ঘরের দিকে তাকালো। না, সে কিছু টের পায়নি, ঘুমাচ্ছে।
ফরিদ চাচার পিছু নিল আলম। যতটা সম্্ভব দূরত্ব রেখেই তাকে অনুসরণ করে চলল ও। খুব দ্রম্নত হাঁটছেন ফরিদ চাচা। চাঁদের আলোয় বারবার হাতঘড়ি দেখছেন। তাতেও সমস্যা হলে রেডিয়াম জ্বালিয়ে নিচ্ছেন।
ফরিদ চাচার সাথে তাল রাখতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে আলমকে। এত জোরে হাঁটছেন কেন তিনি? ভাবতেই জবাব পেয়ে গেল। দশটা বাজতে আর বেশি বাকি নেই। বরং দশটার মধ্যে গন্তôব্যে পৌঁছাতে পারবে কিনা সেটাই সন্দেহ।
আলমও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল।
* * *
বসে থেকে বিরক্তি ধরে গেছে বিপস্নবের। মশার জ্বালাতন আর ভঁ্যাপসা গরমে অসহ্য হয়ে উঠেছে। একটু চুপ থাকলেই কানের কাছে এসে ফ্রি পয়সার গান শুনিয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা মশা। আর দেহের খালি জায়গা ছাড়াও যত্রতত্র কাপড়ের ওপর দিয়ে হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে। তবে মোটামুটি নিঃশব্দেই বসে আছে ও পোড়োবাড়িটার দিকে তাকিয়ে।পোড়োবাড়ির পেছন দিকে ছোট্ট একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়েছে ও। ওর বিশ্বাস, কেউ যদি আজ রাতে পোড়োবাড়িতে ঢোকে তাহলে পেছন দিক দিয়েই ঢুকবে। তাই বিজনকে সামনের দিকে থাকতে বলে নিজে এখানে লুকিয়েছে।
চাঁদের আলো জায়গাটাকে একেবারে অন্ধকার হতে দেয়নি। আশপাশটা মোটামুটি দেখা যায়।
বিশাল এলাকা নিয়ে পোড়োবাড়িটা। দীর্ঘদিন ঘরে লোকজনের বসবাস না থাকায় জংলা হয়ে উঠেছে।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ব্যথা হয়ে গেল বিপস্নবের। এক সময় ভাবল, সত্যিই কি কিছু ঘটবে আজ এখানে? কী ঘটবে? কারা ঘটাবে? আলম এখন কী করছে? ফরিদ চাচার ওপর নজর রাখার কথা তার। তিনিও কী এখানে আসবেন? কেন আসবেন? হঁ্যা, অবশ্যই আসবেন যদি তিনি এর সাথে জড়িত থাকেন।
হঠাৎ নাকের মধ্যে শুড়শুড়ি দিয়ে উঠল বিপস্নবের। হাঁচি ওঠার পূর্বলড়্গণ। কিন্তু এই মুহূর্তে হাঁচি দেয়া যাবে না। একটু আগে ঘড়ি দেখেছে টর্চের আলোয়। দশটা বাজতে দুই মিনিট বাকি। কী করা যায়? উপায়ান্তôর না দেখে হাঁচি চাপার নিমিত্তে ঘন ঘন ঢোক চিপতে লাগল। আশ্চর্য ফল হল তাতে। হাঁচি বন্ধ হয়ে গেল। খুশি হয়ে উঠল ওর মনটা। একটা জিনিস অন্তôত জানা হল।
হঠাৎ দৃষ্টি তীî হয়ে উঠল বিপস্নবের। ওর থেকে খানিকটা বাঁ দিক দিয়ে একটা ছায়ামূর্তি প্রবেশ করেছে। ছায়ামানবটা বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে ভাঙা পরিত্যক্ত বাড়িটার দিকে। কিন্তু এতো সাবধানতা অবলম্বন করার হেতু খুঁজে পেল না বিপস্নব। নাকি বুঝতে পেরেছে কেউ ওদের ওপর নজর রাখছে?
এই সময় আরেকটা ছায়ামানব ওর নজর কাড়ল। একই পথ দিয়ে প্রবেশ করেছে।
জংলাটা থেকে পোড়োবাড়িটার মাঝখানের জায়গাটা মোটামুটি পরিষ্ড়্গার। সামনের ছায়ামূর্তিটা চিনতে না পারলেও পিছনেরটাকে ঠিকই চিনল বিপস্নব- আলম। তাহলে সামনেরটা নিশ্চয়ই ফরিদুল ইসলাম হবেন।
নিঃশব্দে আলমের পেছনে আরো দু’টো ছায়ামানব উদয় হয়েছে। এই রাতেও কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা। হাতে লাঠি।
লোক দু’টোর উপস্থিতি বুঝতে পেরেই আলম একটা বিপদের গন্ধ পেল। বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটবে এুনি। বিদুøৎ খেলে গেল যেন ওর মাথার মধ্যে। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। আলমকে সাবধান করতে হবে।
লাঠি ওপরে তুলল ছায়ামানব দু’টো। হঠাৎ একখণ্ড মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল চাঁদটা। নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল বিপস্নব, ‘আলম, সাবধান----!’
ওর কথা শেষ হল না। কে যেন একটা রম্নমাল দিয়ে পেছন থেকে ওর মুখ চেপে ধরেছে। মিষ্টি একটা গন্ধ ঢুকলো নাকে। ছড়িয়ে পড়তে লাগল মস্তিôষ্ড়্গের কোনায় কোনায়। স্নায়ুগুলো অবসাদে ঢিলা হয়ে যেতে লাগল। চিন্তôাশক্তি লোপ পেতে শুরম্ন করল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না বিপস্নব। অবশ হয়ে আসছে সমস্তô দেহ। আপনা হতেই বন্ধ হয়ে গেল চোখ জোড়া।
ছোট্ট শিশুর কান্না, আর্তচিৎকার ও একাধিক মানুষের ছুটন্তô পায়ের শব্দগুলো বেশ দূরে অজানা কোন স্বপ্নলোকে বলে মনে হল ওর কাছে।
জ্ঞান হারিয়ে লোকটার কোলে ঢলে পড়ল বিপস্নব খান।
ছয়·ফরিদ চাচাকে অনুসরণ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে আলম। এক সময় মনে হল, দূর! এর চেয়ে যাই বাড়ি গিয়ে ঘুমাই গে। কিন্তু বিপস্নবের কথা মনে পড়তেই সে চিন্তôা বাদ দিল। যে অবস্থাতেই হোক, ফরিদ চাচাকে অনুসরণ করতে হবে। চারদিকের ভুতুড়ে পরিবেশ তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করল। দুআ ইউনুছ ও আয়াতুল কুরসি এরই মধ্যে প্রায় পাঁচবার পড়া হয়ে গেছে। আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হল আলম। এবার আর আঘাত করার সুযোগ দিতে চায় না কাউকে।
পায়ের শব্দটা যেন ওর ডান দিকে জঙ্গলের ওপাশে এসে থেমে গেল। নিঃশব্দে এগিয়ে গেল আলম। কাছাকাছি হতে চায়। লুকোচুরি খেলা হতে আবারও বেরিয়ে এলো চাঁদটা। আবছা ছায়া মত আগন্তুককে দেখতে পেল ও। ওর দিকে পেছন ফিরে আছে। আশপাশে কিছু খুঁজল। পেল না। আরেকটু এগোল সামনে।
কঁ্যাক করে ডান বাহু দিয়ে আগন্তুকের গলা পেঁচিয়ে ধরল। এবং গম্্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘পেয়েছি!’
‘আরে ছাড়ো ছাড়ো!’ ফঁ্যাসফেসে গলায় বলে উঠল আগন্তুক। ‘গলায় লাগছে তো!’
‘কে? আগে বল কে তুমি?’ ধমকে উঠল আলম।
‘আরে আমি। আমি বিজন।’
‘বিজন? তুমি এখানে?’ গলা ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল আলম। ‘বিপু ভাই কনে?’
‘ও তো এদিকেই ছিল।’ জবাব দিল বিজন। ‘আমি ছিলাম সামনের দিকে। পায়ের শব্দ আর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে দেখতে এসেছি এদিকে কি হচ্ছে। ---কয়েকজনকে পালিয়েও যেতে দেখলাম। মাথা চেপে ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আরও একটা লোককে দেখলাম পালাতে।--- কি হয়েছে এখানে?’
‘সে অনেক কথা। কিন্তু বিপু ভাইয়া কই?’
‘তাই তো? কনে ও?’
‘নাম ধরে ডেকে দেখব না কি?’
‘সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। বরং এসো আরেকটু অপেড়্গা করি।’
কিন্তু এভারে আরও প্রায় ৭ মিনিট অপেড়্গা করার পরও বিপস্নবের কোন সাড়া ওরা পেল না। এবার সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। বিভিন্ন আশঙ্কা উঁকি দিতে লাগল মনের কোণে। কোন বিপদ হয়নি তো ওর? কোথায় ও?
‘এখন কী হবে?’ বিপস্নবের কণ্ঠে স্পষ্ট ভীতি।
‘বিপু ভাইয়া---?’ জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না মনে করেই গলা চড়িয়ে ডাকল আলম।
‘বিপু ভাইয়া---?’
আলমের সাথে এবার বিজনও যোগ দিল।
আকাশে-বাতাসে ও সামনের বাড়িতে সে ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে ওদের কানেই ফিরে এলো। কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল চার জোড়া কান। ওদের ডাকের জবাবেই যেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল কেউ। ঝাঁপসা অন্ধকারে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল দুই কিশোর।
‘চল দেখি।’ বলে হাঁটা দিল আলম।
বিজন মানা করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই রওনা দিয়েছে আলম। একটু কি যেন ভাবল। নিজের মনেই মাথা ঝাকাল।
তারপর এগিয়ে চলল।
* * *
যেন বহুদিন পর ঘুম থেকে জাগল বিপস্নব। চোখ মেলেই চার ধারে অন্ধকার দেখে গেল ভড়কে। তড়াং করে উঠে বসল। দাঁড়াতে যেতেই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। অগত্যা কিছুড়্গণ ওভাবেই বসে থেকে মাথাটাকে স্বাভাবিক হতে সময় দিল।একে একে সব মনে পড়ে গেল বিপস্নবের। এমনিতেই ডান হাতটা চলে গেল ঘাড়ের পেছনে। ইয়া বড় এক আলু গজিয়েছে ওখানে। ব্যথায় টাটাচ্ছে। দপদপ করে লাফাচ্ছে ঘাড়ের শিরাটা। ‘উহ্!’ করে মুখ দিয়ে বেদনার একটা শব্দ বেরিয়ে এলো।
এই সময় কানে গেল ডাকটা। কারা যেন পালা করে ওর নাম ধরে ডাকছে। হঁ্যা, কণ্ঠ দু’টো ওর খুবই পরিচিত!-----নিশ্চয়ই আলম ও বিজন।
আলম এবং বিজন ঠিক আছে জেনে কিছুটা আশ্বস্তô হল বিপস্নব। উঠে দাঁড়াল। এবার মাথাটা অল্প ঘুরে উঠলেও কোন সমস্যা হলো না।
একটু আগে এখানে কি হয়েছে তা বুঝতে পারল না। এখন সবকিছু কেমন স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কেবল ওর নাম ধরে বিজন এবং আলমের ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। ----কান পেতে শুনল বিপস্নব। একটা বাচ্চা ছেলের কান্নার শব্দ যেন শোনা গেল। দ্রম্নত জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো বিপস্নব। বলল, ‘বিজন! আলম! আমি এখানে।’ কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই বিপস্নবের মাথায় ঢুকছে না। কোরোফর্মে জ্ঞান হারিয়েছে ও। তাহলে মাথায় আঘাতটা পেল কখন? ও জ্ঞান হারানোর পরে কি আঘাত করেছে কেউ? থাকগে, এ বিষয় নিয়ে পরে ভাবলেও হবে।
বিপস্নবকে দেখে খুবই আনন্দিত হল বিজন ও আলম।
আলম বলল, ‘তুমি এতড়্গণ কোথায় ছিলে? -----একি? তোমার ঘাড়ের পেছনে দেখছি ইয়া বড় এক আলু গজিয়ে উঠেছে!’
বিজন বলল, ‘তোমার ঘাড়ের পেছনেও তো ছোটখাটো একটা আলু গজিয়েছে।’
বিপস্নবের দৃষ্টি তখন অন্য দিকে। বিজন ও আলমের মাঝে একটা ছেলের ওপর। বয়স ওদের চেয়ে অনেক কম। বুঝলো, এরই কান্নার শব্দ ও শুনেছে। চোখ-মুখ ফুলে গেছে ছেলেটার। অধিক অশ্রম্নপাতেই এটা হয়েছে বুঝলো বিপস্নব।
বিপস্নব জিজ্ঞেস করল, ‘কে ও? কোথায় পেলে?’
আলম জবাব দিল, ‘ওকে তুমি চিনবে কেমন করে? আগে তো কোন দিন দেখইনি। ও আমার হারিয়ে যাওয়া একমাত্র ভাগ্নে, রাহাত। পেয়েছি---’
আর কোন কথা বিপস্নবের কানে গেল না। চারদিকে যেন প্রচ ৈঝড় উঠেছে। সমুদ্রের বিশাল গর্জন শুনল বিপস্নব তার নিজের মাথার মধ্যে।
সাত·দূরে কোথাও মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো। জায়গাটা একটু আগে নীরব থাকলেও আবার পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠল। ‘অমন করে কি দেখছ? যেন প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেছে তোমার ওপর দিয়ে।’ আলমের প্রশ্ন।
সম্বিৎ ফিরে পেল যেন বিপস্নব। বলল, ‘না, মানে---’
‘আর মানে মানে করতে হবে না। পরে সব শোনা যাবে। আগে চলো বাসায় যাই। খুব টায়ার্ড লাগছে।’
‘কিন্তু তোমরা রাহাতকে পেলে কোথায়?’ বিপস্নবের বিস্ময় এখনও কাটেনি। মনের কোণে যেন এখনও বাচ্চা ছেলের কান্নার ধ্বনি অনুরণিত হচ্ছে।
‘নাহ্! তুমি দেখছি এখনই সব না শুনে ছাড়বে না।’ একটু হাসল আলম। ‘---আমি তো তোমার কথা মত ফরিদ চাচার ওপর চোখ রাখতে লাগলাম। কাজেই রাতে তিনি ঘর থেকে বের হওয়া মাত্র তাকে অনুসরণ শুরম্ন করলাম। চাচা এদিকেই আসতে লাগল। জঙ্গল থেকে বের হতেই কে যেন লাঠি দিয়ে মাথায় বাড়ি মারল। মাথা সরিয়ে নিলেও শেষ রড়্গা হয়নি। আঘাত ঠিকই লাগল। কে যেন আমার নাম ধরে ডেকেছিল, তাতেই কিছুটা সতর্ক হতে পেরেছিলাম। একটা গাছের আড়াল নিলাম। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলল কিছুড়্গণ। তারপর শুনলাম ফঁুপিয়ে কান্নার শব্দ। পোড়োবাড়ির দিক থেকে। কে কাঁদে দেখার জন্য গাছের আড়াল থেকে বের হব, পেছনে পায়ের শব্দে থমকে দাঁড়ালাম। সুযোগ বুঝে কঁ্যাক করে ধরলাম। কিন্তু হায়, সেটা ছিল বিজন। ও-ও চিৎকার আর কান্নার শব্দ শুনে দেখতে এসেছে।’ একটু থামল আলম দম নেয়ার জন্য। তারপর আবার বলল, ‘তোমাকে খুঁজলাম, নাম ধরেও ডাকলাম। কিন্তু কোন সাড়া পেলাম না। কি করব ভাবছি, এই সময় আবার শুনতে পেলাম কান্নার শব্দ। কেমন চেনাচেনা মনে হল ওটা। এগিয়ে গেলাম।----একটা রম্নমে মোমবাতি জ্বলছিল। সেই রম্নমেই পেলাম রাহাতকে।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘কিন্তু তোমার খবর কি বল তো? কোথায় ছিলে এতড়্গণ?’
বিপস্নব সংড়্গেপে জানাল সব। বিজন ওর ড়্গতটা দেখল। না, তেমন মারাত্মক না। তবে ওষুধ খেতে হবে। বলল, ‘দু’টো পেইন কিলার খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।---তো, তোমরা কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু কথাই বলে যাবে, না বাসার দিকে যাবে? আমার কিন্তু প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে।’
ওর কথা যেন বিপস্নবের কানেই ঢুকল না। বলল, ‘ফরিদ চাচা কোথায়?’
এতড়্গণে যেন মনে পড়ল সবার, তাই তো? ফরিদ চাচা কোথায় গেলেন? মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল আলম ও বিজন। আলম বলল, ‘আমরা রাহাতকে ফিরে পেয়ে এতই আত্মহারা হয়ে পড়েছি যে ফরিদ চাচার কথা বেমালুম ভুলেই গেছি।’
‘কুইক!’ বলে পোড়োবাড়ির দিকে হাঁটা দিল বিপস্নব।
‘ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?’ যেতে যেতেই প্রশ্ন করল বিজন। ‘তোমার কি মনে হয় এখনও তিনি ওর ভেতরেই আছেন?’
বিপস্নব না থেমেই জবাব দিল, ‘আমার তা মনে হয় না। কিন্তু----’
বিজন পথ আগলে ধরে বিপস্নবের। জিজ্ঞেস করে, ‘কিন্তু কি? কি ভাবছ তুমি?’
‘উঁ!--- আগে চলো প্রত্যেকটা রম্নম খুঁজে দেখি।’
আলম জিজ্ঞেস করল, ‘এ্যাই বিপু ভাইয়া, তুমি ফরিদ চাচার কোন বিপদের আশঙ্কা করছ না তো?’
বিপস্নব মুখে কোন কথা না বলে উপর-নিচ মাথা নাড়ল শুধু।
‘কী? কী আশঙ্কা করছ তুমি?’ আলমের কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ।
‘আর কোন প্রশ্ন এখন নয়। আগে চলো দেখি।’
আবার চলতে শুরম্ন করল বিপস্নব। অগত্যা অন্য দু’জনও।
ভাবল, বিপস্নব ঠিকই বলেছে। নিশ্চয়ই ফরিদ চাচার কোন বিপদ হয়েছে। না হলে তিনি যাবেন কোথায়?
কিন্তু সব কটা রম্নম তন্ন তন্ন করে খুঁজেও লোকটাকে পাওয়া গেল না। তবে ধস্তôাধস্তিôর স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেল রাহাত যে রম্নমটাতে ছিল সেটাতে। এতে কিছুই পরিষ্ড়্গার হল না। অধিকাংশ না বলে বলা যায় সব রম্নমই পরিত্যক্ত। পুরনো ভাঙাচোরা অচল কিছু আসবাব আর আগাছায় ভরা রম্নমগুলো।
আশপাশেও খোঁজা হল। ফল একই।
কিছু গাছের ভাঙা ডাল, দলা হয়ে যাওয়া ঝোপঝাড় আর মোচড়ানো ঘাস বা পায়ের চিহ্ন থেকে কিছুই অনুমান করা গেল না ফরিদুল ইসলামের কি হয়েছে। কিংবা কি ঘটে গেছে এখানে গত রাতে।
ইতোমধ্যে চারদিক বেশ ফর্সা হয়ে গেছে।
‘আশ্চর্য!’ আনমনে বিড় বিড় করল বিপস্নব। গভীরভাবে ভাবছে কিছু।
‘চাচাকে ওরা ধরে নিয়ে যায়নি তো?’ ভাঙা গলায় বলল আলম। এতড়্গণের উদ্বেগটা চরম আকার ধারণ করেছে। ‘এ্যাই বিপু, কিছু বলছ না যে? কি হয়েছে ফরিদ চাচার?’
রাহাত কিছু না বুঝতে পেরে পালাক্রমে তিনজনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
বাস্তôবে ফিরে এলো বিপস্নব। বলল, ‘হঁ্যা, কিছু একটা হয়েছে তার।’
বিজন ও আলম প্রায় একই সাথে বলে উঠল, ‘কী?’
একটু ভেবে নিল বিপস্নব। তারপর মুখে একটু হাসি টেনে বলল, ‘আপাতত খারাপ কিছু ভাবার কারণ নেই। খারাপ কিছু ঘটলে তার কোন না কোন নিদর্শন আমাদের চোখে পড়তোই।’
‘তাহলে ওই ধস্তôাধস্তিôর চিহ্ন?’ আলমের প্রশ্ন।
বিপস্নব প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। বলে চলল, ‘চলো ফেরা যাক। ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তôা সেরে একটু রেস্ট নিয়ে তারপর আবার আসা যাবে। তখন কিছু চোখে পড়েও যেতে পারে।’
‘কিন্তু আপা যদি ফরিদ চাচার কথা জিজ্ঞেস করে?’
‘সে সম্্ভাবনা খুব কম। তোমার আপা রাহাতকে ফিরে পেয়ে ওসব কিছু অন্তôত কয়েক ঘণ্টা ভুলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আর যদি জিজ্ঞেস কলে, তাহলে----’
ওকে কথা শেষ করতে দেয় না রাহাত। মুঠো ভর্তি চকলেট দেখিয়ে বলে, ‘মামা, চকলেট খাবে?’
‘চকলেট কোথায় পেয়েছিস্?’ আলম অবাক। ‘কে দিয়েছে এত চকলেট তোকে?’
‘কেন, মামা দিয়েছে!’ রাহাতের নির্বিকার জবাব।
‘মামা? কোন্ মামা?’ আরও অবাক হল আলম।
‘আরে ঐ মামা।---তুমি খাবে না? নাও না একটা। খুউব মজা!’
‘না আমি খাব না, তুমিও খাবে না।’ বলে রাহাতের হাত থেকে চকলেটগুলো কেড়ে নিতে গেল আলম। রাহাত ‘ভঁ্যা’ করে কেঁদে ফেলল।
বিপস্নব এতড়্গণ কি যেন ভাবছিল। হাসল একটু। আলমকে বলল, ‘তুমি খামোখা-ই সন্দেহ করছ আলম। ওতে কিছু মেশানো নেই। ভাগ্নেকে না কান্দিয়ে চকলেটগুলো দিয়ে দাও। আর ভালো হয় যদি তুমিও একটা মুখে পুরে চুষতে থাকো।’

আলম ফিরিয়ে দিল সব চকলেট রাহাতকে। কিছু না বলে কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিপস্নবের দিকে।
বিজন একেবারে ‘থ’ মেরে গেছে। কোন কথাই ওর মুখে জোগাচ্ছে না।
বিপস্নব এবার রাহাতের দিকে মনোযোগ দিল। বলল, ‘আচ্ছা রাহাত, যে মামা তোমাকে চকলেটগুলো দিয়েছে তার নাম কি?’
রাহাত যেন বিপস্নবকে এই প্রথম দেখল। আলমকে জিজ্ঞেস করল, ‘ও মামা, এ কিডা (কে)?’
আলম বলল, ‘ও তোমার আরেক মামা। বিপু মামা। এখন তোমার বিপু মামা তোমাকে যা জিজ্ঞেস করছে তার জবাব দাও।’
‘বল বিপু মামা তুমি তোমার প্রশ্ন। কিন্তু তার আগে বল এতদিন তুমি কনে ছিলে?’
বিপস্নব অসহায়ভাবে আলমের দিকে তাকাল। আলমও নিজেকে অসহায় ফিল করল।
ওদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করল বিজন। বলল, ‘তোমাকে পরে সব বলব, কেমন? এখন আমাকে একটা চকলেট দাও তো। ওদেরকেও দাও।’ ওদেরকে চকলেট নিতে ইশারা করল বিপস্নব। রাহাত বিজন ও আলমকে চকলেট দেয়ার পর বিপস্নবের দিকে দু’টো চকলেট এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই নাও বিপু মামা। তুমি নতুন তো, তাই তোমাকে দু’টো চকলেট দিলাম।’
বিপস্নব চকলেট দু’টো নিল। একটা ছিড়ে মুখে দিল। চুষে স্বাদ নিয়ে বলল, ‘বাহ্! দারম্নণ মজা তো!’
রাহাত বলল, ‘থ্যাংকু। এখন বল তোমার কি প্রশ্ন।----ও হঁ্যা, তুমি আমার কাছে ঐ মামার নাম জানতে চেয়েছিলে। বারে! আমি তার নাম জানব কি করে? সে আমাকে তার নাম বলেছে বুঝি?’
‘লোকটা দেখতে কেমন?’
‘লম্বা মত খাটো।’
‘মানে?’
‘মানে হল গিয়ে, মানে। অন্ধকারে কি কিছু বোঝা যায়?’
বিপস্নব বুঝতে পারল ব্যাপারটা। লোকটা যেই হোক, কৌশলে নিজেকে আড়ালে রেখেছে। তবে সে ফরিদুল ইসলাম হলেই বেশি ভালো হবে।
দেখা যাক তদন্তô করে কি বেরোয়।
বাড়ির পথ ধরল ওরা। রাহাত আম্মার কাছে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আবার কান্না জুড়ে দিয়েছে। কিছুতেই কান্না থামানো যাচ্ছে না।
যারা ফজলের নামাজ পড়তে উঠেছিল এবং লাঙ্গল-জোয়াল-গরম্ন নিয়ে মাঠে যাচ্ছিল, তাদের সবাই থমকে দাঁড়িয়ে ুদ্র কাফেলাটিকে দেখল। রাহাতকে দেখে জানতে চাইলো কোথায় পেয়েছে তাকে। রেখে-ঢেকে সংড়্গেপে জানাল আলম।
নাদিরা ইয়াসমিন হারানো সন্তôানকে ফিরে পেয়ে মহাখুশি। কোথায় ছিল, কিভাবে তাকে উদ্ধার করল, ফরিদ চাচা কোথায়- কিছুই জানতে চাইলো না। ছেলেরাও আগ বাড়িয়ে কিছু বলল না। একটু বিশ্রাম নিয়ে সকাল ১০টার দিকে তদন্তেô বের হল ওরা। এবং তদন্তô করে এমন একটা তথ্য জানতে পারল, যা পুরো ঘটনাটার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল।
আট·বের হতে গিয়েও ফরিদুল ইসলামের জন্য বেশ খানিকড়্গণ অপেড়্গা করল ওরা। কিন্তু তিনি এলেন না। অগত্যা তদন্তেô বেরোনোর জন্য প্রস্তুত হল। এই সময় নাদিরা ইয়াসমিন ডাক দিল, ‘এ্যাই আলম, রাহাত এ সব কি বলছেরে? একটু এদিকে আয় তো!’
তিন কিশোর নাদিরা ইয়াসমিনের রম্নমে প্রবেশ করল।
‘কি হয়েছে বুবু?’ জিজ্ঞেস করল আলম। ‘কি বলছে ও (রাহাত)?’
‘ও কি সব আবোল-তাবোল বলছে।’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জবাব দেয় নাদিরা। ‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি নে।’
রাহাত তখনও একঘেয়ে সুরে বলে চলেছে, ‘মামা কত্ত ভালো! আমাকে এতগুলো চকলেট দিল।---’
নাদিরা বলল, ‘শোন্ তুই ও কি বলছে। আরও বলছে ও আবার ওর সেই মামার কাছে যাবে।’
‘সেই মামা মানে?’ আলম অবাক, ‘সেই মামা আবার কে?’
‘তা আমি কি জানি!’
‘রাহাত?’ রাহাতকে ডাকল আলম।
‘বলো মামা।’ সাড়া দিল রাহাত।
‘তুমি এসব কি বলছ মামা তোমার আম্মার সাথে?’
রাহাত যেন আলমের এ কথা শুনতেই পায়নি, আবদারের সুরে বলল, ‘ও মামা, মামা গো, তুমি আমাকে সেই মামার কাছে নিয়ে যাবে?’
‘তোমার সেই মামাটা কে?’
‘দূর! তুমি তো একটা, ইয়ে! বুঝেছি, তুমি নিয়ে যাবে না।’
আলম আর কোন কথা বলে না। বিপস্নবের দিকে তাকাল। কি যেন ভাবছে বিপস্নব।
রাহাত এবার বিপস্নবের কাছে এগিয়ে গেল। ওকে নাড়া দিয়ে বলতে লাগল, ‘এ্যাই বিপু মামা, তুমি তো খুউব ভালো, তাই না? আলম মামার মত বুদ্ধু নও। তুমি আমাকে সেই মামার কাছে নিয়ে যাবে? চলো না বিপু মামা আমাকে নিয়ে! চলো না!’
বিপস্নব কিছুই বলছে না দেখে এবার গাল ফুলিয়ে ফেলল রাহাত। বলল, ‘বুঝেছি, তোমাকে দু’টো চকলেট দেয়া আমার ঠিক হয়নি। তুমিও নিয়ে যাবে না। আম্মু ভালো না, মামা ভালো না, তুমিও ভালো না, কেউ ভালো না, কেউ না!----’ কাঁদতে শুরম্ন করল ও।
বিপস্নবের মুখে হঠাৎ একটা হাসির ঝিলিক দেখা গেল। হাঁটু মুড়ে বসল রাহাতের সামনে।
রাহাত তখন দু’হাতে চোখ ঢেকে ‘উ-উ’ করে ইনিয়ে-বিনিয়ে কেঁদে চলেছে।
বিজন, আলম ও নাদিরা বুঝতে পারে না রাহাতকে কিভাবে থামাবে।
বিপস্নব আস্তেô করে রাহাতের হাত দু’টো চোখ থেকে সরিয়ে আনে। বলে, ‘ছিহ্ মামা, তুমি না খুউব বুদ্ধিমান? বুদ্ধিমানরা যে এভাবে কাঁদে না!’
রাহাত হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়। কান্না থামে না একটুও।
নাদিরা বলল, ‘কেঁদে কেঁদে----’
তাকে কথা শেষ করতে দিল না বিপস্নব, ইশারায় থামিয়ে দিল।
আবার মনোযোগ দিল রাহাতের দিকে। বলল, ‘বেশি কাঁদলে কি হয় জানো? বেশি কাঁদলে চোখের ভেতরে একটা পুকুর তৈরি হয়ে যায়। সেই পুকুর আর কখনও বন্ধ হয় না। সব সময় পানি পড়তেই থাকে। খেতে গেলে, পড়তে গেলে, হাসতে গেলে, ঘুমাতে গেলে-সব সময়।’
এতে কাজ হল। এক নিমিষে থেমে গেল কান্না। বড় বড় ভেজা চোখে বিপস্নবের মুখের দিকে তাকিয়ে রাইল কয়েক সেকেন্ড।
অন্যরা শব্দ করে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
‘সেই পুকুরে বুঝি কুমিরও থাকে?’ বিমর্ষ কণ্ঠ রাহাতের।
হেসে উঠল সবাই। হাসার কারণ বুঝতে না পেরে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগল রাহাত। আবার এসে স্থির হল বিপস্নবের মুখে।
বিপস্নব বলল, ‘এখন আমরা একটা জরম্নরি কাজে বাইরে যাচ্ছি। তুমি তোমার আম্মুর কাছে থাকবে, কেমন? কোন প্রকার দুষ্টুমি করবে না কিন্তু!’
‘তাহলে সেই মামা----?’
‘তোমার চকলেট মামাকেই তো আমরা খুঁজতে যাচ্ছি।’
ঝট করে ওর দিকে তাকালো আলম ও বিজন।
বিপস্নব একটা চোখ টিপল। বুঝালো, এখন না, পরে সব বলব।
‘আচ্ছা যাও তবে।’ বলল রাহাত।
বিপস্নব রাহাতের গালের চামড়া অল্প টেনে আদর করল।
‘তুমি সত্যিই ভীষণ ভালো বিপু মামা।’ বলল রাহাত। ওর এখনকার এই হাসি মুখ দেখে কে বলবে একটু আগেই কেঁদে-কেটে বুক ভাসাচ্ছিল?
বিপস্নব প্রতিউত্তরে বলল, ‘তুমিও ভারি মিষ্টি।’
তারপর নাদিরাকে রাহাতের দিকে খেয়াল রাখতে বলে বেরিয়ে এলো ওরা।
রাস্তôায় পৌঁছতেই বিপস্নবকে ছেকে ধরল আলম এবং বিজন। একের পর এক প্রশ্ন করে চলল ওরা।
বিপস্নব মুখ বুজে সব শুনল। ক্রমে মুখটা গম্্ভীর হয়ে উঠল। সে অবস্থাতেই প্রায় ফিস ফিস করে বলল, ‘শোনো, অত ব্যস্তô হয়ো না। মনে রেখো, সবুরে মেওয়া ফলে। আর একটা কথা, এখন থেকে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। ও·কে?’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলম বলল, ‘ও·কে।’
বিজন আগেই জানে বিপস্নবের চরিত্র সম্পর্কে। তাই বলল, ‘জো হুকুম জাহাপনা।’ মুচকি একটু হেসে পরিবেশটাকে হাল্কা করতে চাইল বিপস্নব। বলল, ‘তোমরা মুখটা অমন হাড়ির তলার মত করে রেখেছ কেন?’
হেসে দিল অন্য দু’জন। বেশ হাল্কা হয়ে গেল পরিবেশটা।
আবার চলতে শুরম্ন করল।
* * *
কথা বলতে বলতে ওরা ওদের গন্তôব্যে চলে এসেছিল।হঠাৎ নিজেদেরকে পোড়োবাড়ির সামন দেখতে পেল। যেন নতুন আবিষ্ড়্গার করছে। প্রথমবারের মত নতুন কিছু নজরে এলে মানুষ যেভাবে দেখে, ঠিক সেইভাবেই ওরা সেদিকে তাকিয়ে থাকল পাক্কা আড়াই মিনিট। তারপর আশপাশে সতর্ক দৃষ্টি মেলে দেখল কেউ ওদের ওপর নজর রাখছে কিনা। সন্দেহজনক কিছু কারোর চোখে পড়ল না।
‘বিসমিলস্নাহ’ বলে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল তিন কিশোর।
গতরাতের সেই পেছন দিক দিয়েই ঢুকেছে ওরা। কিন্তু আশ্চর্য! রাতের কোন নিদর্শনই এখন আর চোখে পড়ছে না। ভাঙা ডাল-পালা, কোথায় উধাও হয়ে গেছে! দোমড়ানো ঘাস-লতাকে চেষ্টা করা হয়েছে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার।
এগিয়ে চলল ওরা, অতি সন্তôর্পণে।
চারদিকে স্বাভাবিক পরিবেশ। অন্তôত তাই মনে হল ওদের কাছে। অবশ্য গুমোট একটা ভাব বরাবরই বিরাজ করছে।
বিপস্নব বিল্ডিংটার সৌন্দর্য উপভোগ করছে। উদ্ধারের চেষ্টা করছে তার হারানো ঐতিহ্য। ভাবছে, ‘একতলা বিল্ডিংটার অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। ঝড়-বৃষ্টি হলে এখনও নিশ্চয় ঝুপঝুপ করে খসে পড়ে চুন-সুড়কি। তবে সংস্ড়্গার করলে হয়ত গুরম্নত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হতে পারত এটা। সরকারের পুরাতত্ন বিভাগের আগেই এদিকে নজর দেয়া উচিত ছিল। যদিও চৌধুরী মোঃ আজিম বাড়িটা কিছু জায়গাসহ কিনে নিয়েছেন, তারপরও----’ এই জায়গায় এসে ভাবনা হোচট খেল বিপস্নবের। কি একটা কথা মনে পড়ে গেছে। মনে মনে সেটা নিয়েই ভাবতে লাগল।----
আলম ও বিজনের গা ছম ছম করছে। নির্জন পোড়োবাড়িটা যেন চিৎকার করে বলছে, ‘না এসো না! এসো না! এসো না তোমরা! যাও! ফিরে যাও! সময় থাকতে পালাও!’
বিজনের মনে হল, সে ঝেড়ে পিছনে দৌড় দেবে। কিন্তু নিজেকে দ্রম্নত সামলে নিল। ভাবল, দূর! ভূত বলে কিছু আছে নাকি? তারপরও ভয়টা পুরোপুরি গেল না।
আলমের বেশ ভয় লাগছে। এই বুঝি বিশাল দানবাকৃতির এক দৈত্য ‘হালুম!’ বলে হামলে পড়ল। আলম যেন দৈত্যটার লকলকে চিহ্বাটাও দেখতে পাচ্ছে।
বিজনের মাঝে কোন পরিবর্তন নেই। ভাবছে, পোড়োবাড়িটা যেন ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। দেড় মিনিটের পথ, অথচ মনে হল কয়েক ঘণ্টা পর ওরা পোড়োবাড়িতে প্রবেশ করল। বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে পোড়োবাড়িটা। ঘুরে সামনে চলে এলো ওরা। চওড়া বারান্দা মাটি থেকে বেশ উঁচুতে। চারটে সিঁড়ির উঁচু ধাপ টপকে তবে বারান্দায় উঠতে হয়। বাড়িটার সামনে ওদেরকে ুদ্র তিনটি পীপিলিকার মত মনে হল।
ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে এলো ওরা। বারান্দার অধিকাংশ পিলারের চলটা ওঠা। ভেতরের রড-সুরকি বেরিয়ে পড়েছে। ছাদও কয়েক জায়গায় ছিদ্র হয়ে গেছে। দেয়ালে ছ্যাত্লা ধরে গেছে। ছোট ছোট লতা-গুল্ম-বৃড়্গও গজিয়ে উঠেছে ফাঁক-ফোকরে। অনেকগুলো রম্নম। অধিকাংশ রম্নমের অবস্থাও একই। ছাদ খসে পড়েছে, বেরিয়ে পড়েছে রড ও লাল ইট। ভেঙে গেছে দরোজা-জানালা।
একে একে সব ক’টা রম্নমে তদন্তô করার সিদ্ধান্তô নিল বিপস্নব। সেই অনুযায়ী কাজে নেমে পড়ল। কিন্তু না, অধিকাংশ রম্নমই পরিত্যক্ত। কিছু পাবার আশা যখন এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছে, ঠিক তখনই উত্তরের কোনার একটা রম্নমে বিপস্নব জিনিসটা আবিষ্ড়্গার করল। এই রম্নমটার জানালার কপাট শূন্য। কেবল কয়েকটা কব্জা আর চৌকাঠ অবস্থান করছে। তাও যায় যায় অবস্থা।
বিপস্নব খোলা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একটা ‘লেক’ দেখা যাচ্ছে। বোঝায় যায় পানি খুবই কম। মোটামুটি বৃহৎ লেকটার মাঝখানে অল্প একটু পানি। যেন একটা কচুপাতা এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি ধরে রেখেছে। এছাড়া বাকিটা আগাছায় ঢেকে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সেটা না। সঙ্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভাঙা জং ধরা কব্জা থেকে এক টুকরো কাপড় ছাড়িয়ে নিল।
‘আরে!’ কাপড়ের টুকরোটা হাতে নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করল আলম। কিছুটা উদ্বিগ্নও। ‘এটা তো কেমন চেনা চেনা লাগছে!’
‘ঠিকই ধরেছো আলম,’ বলল বিপস্নব। ‘কাল আমি তোমার ফরিদ চাচাকে এই রঙের শার্ট গায়ে দিতেই দেখেছি।’
‘তার মানে----’
আলমের কথা শেষ হল না, তার আগেই বিজন বলে উঠল, ‘রক্ত!’
সবাই দেখল। চৌকাঠে ছিটেফোঁটা কয়েক ফোঁটা রক্ত এবং জানালার নিচে এক ছোপ রক্ত শুকিয়ে আছে কিছু ঘাসসহ।
এই সময় রম্নমটার মধ্যে গুম গুম করে উঠল একটা কণ্ঠ, ‘রক্ত! আমার চাই তাজা রক্ত!!’
চমকে উঠল তিন কিশোর। পাঁই করে পেছন ফিরলো।
নয়·লোকটা বিশাল দেহের অধিকারী। কালো, পুরম্ন ওভারকোটে সমস্তô শরীর আবৃত। মুখে ডোরাকাটা কালো মুখোশ। হাতে কালো দস্তôানা। মুখোশের ফাঁক দিয়ে চোখ দু’টোকে ভয়ঙ্কর লাগছে। যেন কোন হিংস্র নেকড়ে শিকারের অপেড়্গায় আছে। ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্ব মুহূর্তে ঠাwৈ দৃষ্টিতে শেষ পর্যবেড়্গণ সেরে নিচ্ছে।
‘ভূ----ভূ----ভূ-----!’ আলমের কথা সম্পূর্ণ হয় না।
‘না- আ---!’ বিজনের গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ বের হয়।
‘কে? কে আপনি?’ ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল বিপস্নব।
‘তোমরা চলে যাও!’ বিপস্নবের প্রশ্নের কোন জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না ওভারকোটধারী। যেন ঠাwৈ কলসের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো কণ্ঠটা, চাপা হিসহিসে। ‘এদিকে, আর কখনও এসো না!’
‘কিন্তু আপনি-----!’ বিপস্নব কথা শেষ করতে পারল না। থেমে যেতে বাধ্য হল শব্দ দু’টো উচ্চারণ করেই। কারণ, ওভারকোটধারী তখন রম্নমের ভেতরে পুরোপুরি প্রবেশ করেছে বরং ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
আতঙ্কে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল ছেলেদের চোখ-মুখ।
আলম তো ঠক্ঠক্ করে কাঁপা শুরম্ন করেছে।
বিজন আলমকে জাপটে ধরে ভয় তাড়ানোর কসরত করছে।
ওভারকোটধারী সোজা জানালাটার দিকে এগিয়ে গেল। সরে জায়গা করে দিল ওরা। কোন দিকে না তাকিয়ে উঠে পড়ল চৌকাঠে লোকটা। তারপর একলাফে জানালার ওপাশে।
দ্রম্নত এগিয়ে এলো বিপস্নব। হেঁটে চলেছে লোকটা। গাছপালার ওপাশে হারিয়ে গেল। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল।
কিছুটা শান্তô হল ছেলেরা।
থেমে গেছে আলম ও বিজনের কাঁপাকাঁপি।
বিপস্নবের ললাটে চিন্তôার দু’টো ভাঁজ পড়ল। কোথায় যেন একটু ঘাপলা আছে। ধরতে পারছে না ও।
‘চল আমরা চলে যাই।’ বলল আলম। গলাটা যেন একটু কেঁপে গেল।
‘হঁ্যা বিপু,’ বলল বিজন। ওর কণ্ঠেও ভয়, ‘চল চলে যাই!’
কিন্তু বিপু নট্ নড়নচড়ন। চলে যাওয়ার কোন লড়্গণই ওর মধ্যে প্রকাশ পেল না। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কি ভাবছে।
‘এই বিপুঃ জিজ্ঞেস করল বিজন। ‘কি ভাবছ অমন করে?’
‘উঁ!’ যেন সম্বিৎ ফিরে পেল বিপস্নব। বলল, ‘না কিছু না। চলো।’
খুশি হল আলম ও বিজন। পিছু নিল বিপস্নবের।
দরোজা পেরিয়ে বারান্দা, তারপর ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো ওরা। কিন্তু আলম ও বিজনের মুখে আবারও ছায়া নামল যখন দেখল বাড়ির পাশ কাটিয়ে পেছনের দিকে মজা লেকটার দিকে এগিয়ে চলেছে বিপস্নব।
থমকে দাঁড়াল ওরা। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
আলম জিজ্ঞেস করল, ‘ওদিকে কোথায় যাচ্ছ বিপু ভাইয়া?’
বিপস্নব ওদের থেকে গজ তিন মত এগিয়ে গিয়েছিল। দাঁড়িয়ে এদিক ফিরে বলল, ‘আমি লেকের ওপাশটা একটু দেখতে চাই। তোমরা ইচ্ছে করলে আসতে পারো, আবার চলেও যেতে পার।’ বলে আবার হাঁটা শুরম্ন করল।
কয়েক মুহূর্ত উভয়ে উভয়ের দিকে তাকিয়ে রইল বিজন ও আলম। যেন সিদ্ধান্তô নিল কী করবে। বিপস্নবকে একা ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে ওর সাথে যাওয়ায় স্থির করল। তাকাল সামনে।
বিপস্নবের যে ভয় করছে না, তা নয়। তবে সহজে হাল ছাড়ার ছেলে ও নয় বলে রড়্গে। দুরম্ন দুরম্ন বুকে নিঃশ্বাস প্রায় ভারি হয়ে আসে। লেকটা দূর থেকে যত বড় মনে হয়, আসলে তার চেয়ে বেশি বড়। লম্বা লম্বা ঘাস আর ছোট ছোট ঝোপজঙ্গলে ছেয়ে গেছে অধিকাংশটা। মাঝখানে অল্প একটু পানি সগৌরবে লেকের অস্তিôত্ব ঘোষণা করছে।
পুরো অঞ্চলটা জুড়ে মাটির দেখা পাওয়া কষ্ট। কোথাও কোথাও ঘাস বা লতাগুল্ম দেখা না গেলেও অর্থাৎ না জন্মালেও পাশে জন্মানো লম্বা লতা গাছ জায়গাটুকুকে ঢেকে দিয়েছে।
অতিরিক্ত নীরব চারপাশটা। শূন্যে খাঁ-খাঁ এক রব যেন বেজেই চলেছে। আড়াল থেকে কেউ চাপা অট্টহাসি দিচ্ছে মনে হল। কেমন গা ছমছমে পরিবেশ। এমনিতেই গায়ে কাঁটা দেয়।
লেকের ওপাশে আবার শুরম্ন হয়েছে জঙ্গল। ওপাশে চলে এলো দলটা। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে সঙ্গীদের দেখে নিল বিপস্নব। অভয় দেয়ার জন্য একটু হাসল। বলল, ‘ভয় পেও না, এসো।’ আবার হাঁটতে শুরম্ন করল।
ক্রমান্বয়ে গাছের আকার ছোট থেকে বড় হতে শুরম্ন করেছে। লতা-ঝোপে একেবারে ছেয়ে গেছে। চলা অত্যন্তô কষ্টকর। এবং অভেদ্য প্রায়। সামনের জিনিসও ভালো দেখা যায় না। ওরা আশ্চর্য হয়ে লড়্গ্য করল পায়ে চলা একটা পথ সোজা উত্তর দিকে এগিয়ে গেছে। ‘নিয়মিত কারোর যাতায়াত আছে এই পথে।’ ভাবল বিপস্নব। চোখ-মুখ বাঁচিয়ে দু’হাতে ডাল-লতা সরিয়ে এগিয়ে চলল। আর চাপা কণ্ঠে বলল, ‘এ পথে কেউ নিয়মিত যাওয়া-আসা করে। কাজেই সাবধান!’
এক জায়গায় লতাপাতাগুলোকে চ্যাপ্টা মনে হল। হাঁটুমুড়ে তার সামনে বসল বিপস্নব। তীîভাবে পর্যবেড়্গণ করল। তারপর বলল, ‘বেশি আগে ভাঙেনি এগুলো।’
বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘লোকটা এদিক দিয়ে যায়নি তো, কালো ওভারকোটওলা?’
‘হয়ত যেতে পারে।’ জবাব দিল বিপস্নব। হঠাৎ সামনে দৃষ্টি রেখে বলে উঠল, ‘ও---ওটা কী?’
ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল আলম ও বিজন। বিজন একটু এগিয়ে ভাঙা গাছটার ওপাশ থেকে জিনসটা উঠিয়ে হাতে নিল। স্বগোতক্তি করল, ‘ফরিদ চাচার শার্টের ছেঁড়া অংশ! কিন্তু----’
বিজনকে কথা শেষ করতে দিল না বিপস্নব। টুকরোটা ওর হাত থেকে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে বলল, ‘কুইক!’
আবার এগিয়ে চলল দলটা। সবার আগে বিপস্নব, মাঝে আলম ও পেছনে বিজন।
বুকের খাঁটায় হাতুড়ি পেটা শুরম্ন করেছে হৃৎপিণ্ডত্রয়। ভয়ে ও উত্তেজনায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
এখন আরও বেশি সতর্ক ওরা।
পায়ে হাঁটা পথটা হঠাৎ ডানে টার্ন নিল। এখানে বেশকিছু ডালপাতা জড়ো করা দেখল ওরা। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। ভাবল সবাই, ‘ব্যাপার কী? কী আছে এর নিচে? এভাবে পথটা আটকে দেয়ার মানে কী? বোঝায় যায় একটু আগেই এই কাজটা করা হয়েছে। তাহলে কি ওদের উপস্থিতি ধরা পড়ে গেছে? ওদেরকে আর সামনে যেতে দিতে চায় না কেউ? কেন চায় না? কে চায় না? এ সবের কোন উত্তর ওদের জানা নেই। তারপরও বারবার প্রশ্নগুলো মাথার মধ্যে উঁকি দিতে লাগল। তাহলে কি ফিরেই যাবে ওরা?
সিদ্ধান্তô নিয়ে ফেলল বিপস্নব। না, ফিরে ও যাবে না। বরাবর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই ও আনন্দ পেয়েছে। আজও বিফল হবে না। এত দূর এসে ফিরে যাওয়া মানে হার স্বীকার করে নেয়া। না, ও হার স্বীকার করবে না। কার কাছে হার স্বীকার করবে? যার অস্তিôত্বই এখনও পর্যন্তô অদৃশ্য, তার কাছে? দেখা যাক, সামনে হয়ত দেখাও হয়ে যেতে পারে তার বা তাদের সঙ্গে।
ওটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তô নিল বিপস্নব। বলল সে কথা সঙ্গীদের। ওরা মাথা কাত করে সায় জানাল।
বিপস্নব পা বাড়াল, এক পা একটু সামনে দিতেই ঝুপ করে একটা শব্দ। সেই সাথে তীî ভয়ার্ত চিৎকার।
থমকে দাঁড়াল বিজন ও আলম। বিপস্নবকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
দশ·হতভম্ব হয়ে গেছে আলম এবং বিজন। কোথায় মিলিয়ে গেল বিপস্নব?
‘বিপুউউ---!’ অনেকটা অনুচ্চ স্বরে ডাকল বিজন। ‘বিপু কোথায় তুমি?---’
কান পেতে রইল দু’সেকেন্ড জবাব শোনার আশায়। কিন্তু না, কোন জবাব এলো না।
ভয়ই পেয়ে গেল ওরা।
খুঁজতে লাগল এদিক-ওদিক।
আবার ডাকতে যাবে বিজন, এই সময় শোনা গেল, ‘এ্যাই আলম, বিজন, আমাকে তুলছ না কেন? জলদি তোল। দম আটকে মরে গেলাম!’
কোত্থেকে এলো শব্দটা?
আলম বলে উঠল, ‘ওই যে, গর্ত! বিপু ভাইয়া নিশ্চয়ই ওর মধ্যে পড়ে গেছে।’
‘হঁ্যা, আমি গর্তে পড়ে আছি ,আমাকে তোল।’
এবার চিনতে পারল ওরা কণ্ঠটা। সাহায্যে এগিয়ে গেল।
লতা-পাতা যেখানটায় দলা করা হয়েছিল, তার নিচে গর্তটা। লতা-পাতা দিয়ে মূলত গর্তটা ঢেকে রাখা হয়েছিল।
গর্তটা মোটামুটি গভীর। কিভাবে বিপস্নবকে তুলবে তা ভাবতে লাগল দুই কিশোর।
‘তুমি নিচে হাত বাড়িয়ে দাও, আমি তোমার পা ধরে রাখব।’ পরামর্শ দিল আলম। বিজন গর্তের কিণারে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল গর্তের মুখ দিয়ে ভেতরে। বিপস্নবও হাত বাড়িয়ে দিল উপর দিকে। কিন্তু কারোর হাত কারোর নাগাল পেল না।
বিজন বলল, ‘ধরতে পারছি না তো!’
আলম ওর পা দু’টো ধরে টেনে রেখেই বলল, ‘তুমি আরেকটু ঝুঁকে যাও।---হঁ্যা, আরেকটু।
--ভয় নেই, পড়বে না। আমি শক্ত করে ধরে আছি।’
বিজন প্রায় ঝুলে পড়ল গর্তের মধ্যে।
‘হঁ্যা, এই তো, আরেকটু!’
বিজন বলল, ‘বিপু, তুমি একটু লাফ দিয়ে আমার হাতটা ধর। ---হঁ্যা, দাও লাফ।’
হুড়মুড় করে বিজনও পড়ে গেল গর্তের মধ্যে। আলম ওদের দু’জনের টান সইতে না পারায় হাতের মধ্যে থেকে বিজনের পা ছুটে গেছে। ব্যথায় ককিয়ে উঠল বিজন।
ওদের অবস্থা দেখে হাসি পাচ্ছে আলমের। মুখে হাত চাপা দিয়ে জোর করে তা আটকে রেখেছে। বলল, ‘তোমরা দু’জন বরং ওখানেই ঘর-সংসার পাতো। আমি যাই, কেমন!’
যাওয়ার কথা বললেও গেল না আলম। ওখানে দাঁড়িয়েই বিজনের ঘাড় ডলা দেখল এবং মুখ টিপে হাসতে লাগল।
বিপস্নব বলল, ‘আশপাশে কোথাও কোন লতা গাছ পাও কিনা দেখ আলম।’
‘রাইট!’ হাতে তুরি বাজাল আলম। ‘এুনি দেখছি।’
আলম খুঁজতে লাগল লতাগাছ। বেশি খুঁজতে হল না, এখানকার বাগানে প্রচুর লতাগাছ জন্মেছে। তবে একটু লম্বা ও মজবুত দেখে দুই তিনটা লতা ছিঁড়ে জোড়া দিতে হল। একটা গাছে এক মাথা বেঁধে অন্য মাথা গর্তের মধ্যে ঝুলিয়ে দিল। এরপর গর্ত থেকে উঠে আসতে ওদের আর বেশি বেগ পেতে হল না।
উপরে উঠে একটু রেস্ট নিল।
হঠাৎ খুব জোরে একটা বাতাস বয়ে গেল। চমকে উঠল ছেলেরা। বাতাসে যেন কারা ফিস্ফিস্ করে কথা বলছে।
বিপস্নবকে জিজ্ঞেস করল বিজন, ‘এখন কি করবে? ফিরে যাবে?’
একটু ভাবল বিপস্নব। তারপর বলল, ‘না, ফিরে যাব না। আরেকটু দেখব।’
‘যদি আরও গর্ত থাকে?’ ঘাড়ের ব্যথার কথা ভুলতে পারছে না বিজন।
‘আরও একটু সাবধানে চলতে হবে আমাদের।’
যথেষ্ট রেস্ট নেয়া হয়েছে ভেবে আবার রওনা দিল ওরা। পায়ে চলা পথটা ধরে এগিয়ে চলল। তবে আরও বেশি সতর্ক রইল। আর কোন গর্তে পড়ে সময় নষ্ট করতে চায় না। সামনে বনটা হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। একটা রাস্তôা চলে গেছে আড়াআড়ি। রাস্তôায় পৌঁছে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। সাবধানে এ-মাথা ও-মাথা উঁকি দিল। নির্জন।
‘এদিকে এমন একটা রাস্তôা আছে তা তো আমাকে বলনি।’ অনুযোগ করল বিপস্নব।
বিজন বলল, ‘এটা তো আমরাও জানতাম না।’
আলম বলল, ‘এদিকে, কোনদিন আসিনি আমরা কেউ।’
পোড়োবাড়ির এপাশটা সরাসরি পেছন দিক না, একটু বায়ে। জঙ্গল এদিকে একটু ঘন।
‘তুমি ও আলম,’ বিজনকে বলল বিপস্নব। ‘রাস্তôার ওমাথা পর্যন্তô দেখে আসবে। আমি যাব এদিকটায়। সন্দেহজনক কিছু নজরে পড়লে কোকিলের ডাক ডাকবে দু’বার। মনে রাখবে, বিশ মিনিট পর আবার আমরা এই জায়গাটায় মিলিত হব।’
‘মাথা নাড়িয়ে বিজন বলল, ‘ও·কে·। তাই হবে জনাব।’
তারপর একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যার যার পথে রওনা দিল ওরা।
* * *
ঠিক বিশ মিনিট পর ঐ জায়গাটায় এসে মিলিত হল তিন কিশোর।সন্দেহজনক কোন কিছু কারোর নজরে পড়েনি।
রিপোর্ট আদান-প্রদানের পর বিপস্নব বলল, ‘এদিকে কিছু পাওয়া যাবে বলে আমি অবশ্য কিছু আশাও করিনি।’
আলম জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা আসলে কি খুঁজছি? আমার মনে হচ্ছে গোলক ধাঁধার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছি।’
বিপস্নব জবাব দিল, ‘জানিনা কি খুঁজছি। তবে এমন কিছু খুঁজছি যা থেকে অনুমান হয় ফরিদুল ইসলাম সাহেবের কি হয়েছে, রাহাতকে ওখানে কারা রেখেছিল।’
‘ও।’ আর কোন কথা না পেয়ে চুপ করে গেল আলম।
বিপস্নব নিচের ঠোঁটে বার দুই চিমটি কাটল দাঁত দিয়ে। বলল, ‘আবার গোড়া থেকে শুরম্ন করতে হবে আমাদের।’
‘মানে?’ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল বিজন।
‘আমরা সম্্ভবত ভুল পথে চলে এসেছি।’ বলল বিপস্নব। যেখান থেকে পথটা ডানে মোড় নিয়েছে, ওখান থেকেই খুঁজতে হবে। আমার বিশ্বাস, পথ আরও একটা আছে।’
ফিরে চলল তিনজনের ছোট্ট দলটা। গন্তôব্য জানা, তাই পৌঁছতে দেরি হল না।
পায়ে চলা পথটা যেখানে ডানে মোড় নিয়েছে, সেখানে প্রকা ৈএকটা মেহগনি গাছ। ওর ওপাশে সার দিয়ে আরও কয়টা গাছ। একই আকৃতির।
‘খোঁজ সবাই।’ বলল বিপস্নব।
গোপন একটা পথ খুঁজতে লাগল তিন জোড়া চোখ।
মেহগনি গাছটার বাঁ পাশে ছোট একটা জঙ্গুলে গাছ। গাছটা থেকে কিছু লতা-পাতা নেমে এসেছে মাটিতে। কয়েকটা লতা মেহগনি গাছটাকেও জড়িয়ে ধরেছে।
এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল বিপস্নব। কি মনে করে লতা ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে গেল। এবং অবাক হয়ে দেখল বড় মেহগনি গাছগুলোর গা ঘেষে মসৃণ একটা পায়ে হাটা পথ এগিয়ে গেছে। সঙ্গীদের ডাকল ও। তারপর অতি সন্তôর্পণে এগিয়ে চলল।
পাশাপাশি দুইজন হাটা যায় না, তাই আগে পিছে চলেছে ওরা।
এদিকে, জঙ্গল আরও ঘন। অল্প দূর যাওয়ার পর দৃষ্টি আর সামনে চলে না। মনে হল, গাছ-লতা মিলে একটা অংশকে দুর্ভেদ্য করে তুলেছে।
বাতাস ওদের সামনে দিয়ে আড়াআড়ি প্রবাহিত হচ্ছে। হঠাৎ দিক পরিবর্তন হয়ে ওদের দিকেই প্রবাহিত হতে লাগল। বিপস্নব সবার আগে ছিল, তাই সিগারেটের কটু গন্ধটা প্রথমে ওর নাকেই প্রবেশ করল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়াল অন্যরাও। ওদের নাকেও প্রবেশ করেছে কটু গন্ধ। এবার সিগারেটের গন্ধের সাথে কয়েকটা কথাও ওদের কানে ঢুকল। কান খাড়া করে ফেলল বিপস্নব। কিন্তু বাতাস ততড়্গণে আগের নিয়মে বইতে শুরম্ন করেছে।
বাঁদিক থেকে ডান দিকে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। ওদেরকে ওখানে থাকতে বলে ডান দিকে সরে এলো বিপস্নব।
বেশ খানিকটা সরে আসার পর আবার কথার শব্দ কানে ঢুকল ওর। দাঁড়িয়ে পড়ে কান পাতল। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না। কেবল যখন একটু জোরে বাতাস বইছে, তখনই দু’একটা ছেড়াছেড়া কথা কানে আসছে। তবে দু’জন কথা বলছে এটা শিওর হওয়া গেল।
বিপস্নব স্পষ্ট শোনার জন্য চেপে আসতে লাগল। সামনের লতা-পাতা দু’হাতে ফাঁক করে উঁকি দিতেই দেখতে পেল লোক দু’জনকে। ওর দিকে পেছন ফিরে কি বিষয়ে আলাপ করছে আর সিগারেট ফুঁকছে।
জোরে বাতাস বইল একটা। বিপস্নব শুনতে পেল ওরা বলছে, ‘নিয়াজ সাহেব এইবারই ধরা খেয়ে যাবেন।’
অন্য লোকটা বলল, ‘যাবেন না? বসের সথে টক্কর দিয়ে কেউ টিকে থাকবে বলে আমার বিশ্বাসই হয় না।’
‘এমন মালদার লোক আমি খুব কমই দেখেছি।’
‘চৌ---’
আর শুনতে পেল না বিপস্নব। বাতাসের বেগ আবার কমে গেছে। সেই সথে ভারি একটা কিছু ওর নাকমুখ চেপে ধরেছে।
শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ওর। জোরে শ্বাস নিতে চাইলো। আর সেই সাথে মিষ্টি একরাশ বাতাস প্রবেশ করল ওর ফুসফুসে। ক্রমে সেটা সংক্রমিত হল সমস্তô দেহে। দ্বিতীয়বারের মত কোরোফরম্ড হল বিপস্নব।
এগার·বিপস্নব চলে যেতেই নিজেদেরকে একটু আড়ালে নিল ওরা।
কান খাড়া করে রেখেছে। আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।
ওরা যে ঝোপটার আড়ালে লুকিয়েছে সেখানে প্রচুর মশা। মশা তাড়ানোর চড়াৎ চড়াৎ শব্দ হচ্ছে। কিছুতেই শব্দ বন্দ করতে পারছে না।
পলপল করে বয়ে চলেছে সময়। উত্তেজনায় কাঁপছে দু’জনেই। বারবার আশঙ্কা করছে এই বুঝি কেউ ওদের দেখে ফেলল।
‘কি হল তোমার আবার?’ জিজ্ঞেস করল বিজন।
‘পেটের নাড়িভুড়ি সব জ্বলে যাচ্ছে!’
হঠাৎ যেন খেয়াল হল, বিজনের রিস্টওয়াচ দেখল। বলল, ‘হায় হায়! কখন দুপুর পার হয়ে গেছে! তাই তো বলি, পেটের ভিতর ছুঁচোটা অমন নৃত্য জুড়ে দিয়েছে কেন? কিন্তু বিপু ফিরে না এলে তো ফেরা যাচ্ছে না!’
‘কি করবে এখন? এগিয়ে গিয়ে দেখবে?’
‘সে কি ঠিক হবে? বিপু আমাদেরকে এখানে বসিয়ে রেখে গেছে।’
‘তাহলে---’ আলমের কথা শেষ হল না। কাছেই কোথাও ‘ঘেউ’ করে উঠল একটা কুকুর। একটু পরেই দেখা গেল ওটাকে। কুচকুচে কালো এ্যালসেশিয়ান।
অন্তôরাত্মা খাঁচা ছাড়ার জোগাড় হল দু’জনের। ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে কুকুরটা।
উঠে দাঁড়াল ওরা। দুই জোড়া চোখ কুকুরটার ওপর নিবদ্ধ। ধারাল দাঁত বের করে মুখ খিঁচে ওদের দিকেই দ্রম্নত এগিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর জন্তুটা।
আর ভাবার কোন সময় নেই। খেঁচে পেছনে ছুটল ওরা। কে কার আগে ছুটতে পারে তারই যেন প্রতিযোগিতায় মেতেছে।
ডাল-পাতা ভেঙে দুদ্দাড় শব্দে দৌঁড়াচ্ছে ছেলেরা। পেছনে তেড়ে আসছে মাংসলোভী এ্যালসেশিয়ান।
বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ওরা। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে আবার ছুটছে।
বুকের মধ্যে হৃৎপি ৈদু’টো পাগলা নৃত্য জুড়ে দিয়েছে যেন। হাফানোর শব্দ দশহাত দূরের গাছপালা ও অন্যরাও বুঝি শুনতে পাচ্ছে।
বাঁচার তাগিদে ছুটছে দুই কিশোর। মজা লেক, পোড়োবাড়ি, সামনের পাতলা জঙ্গল সব ছাড়িয়ে মেইন রাস্তôায় ওঠার পরও ছোটা থামাল না।
এখন আর এ্যালসেশিয়ানের ডাক শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু আরও কিছুটা ছোটার পর থামল ওরা। কান পেতে শুনল। না, ‘ঘেউ ঘেউ’ শব্দ আর নেই।
দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁফাচ্ছে দু’জনে। বুক দু’টো হাপড়ের মত ওঠা-নামা করছে। ধীরে ধীরে শান্তô হয়ে এলো কিছুটা। লম্বা করে দম নিয়ে তাজা বাতাস টেনে নিল ফুসফুস ভরে।
‘বিপুকে ফেলে এভাবে চলে আসা কি ঠিক হল?’ বলল বিজন। এখনও হাঁফাচ্ছে।
আলম বলল, ‘আমরা তো আর ইচ্ছে করে আসিনি। ওই কুকুরটা---!’ শিউরে উঠল।
‘কী ভয়ঙ্কর!’ বলল বিজন। ‘অমন ভয়ঙ্কর কুকুর আমি জীবনে দেখিনি। একবার ওর দাঁতের সামনে পড়লে কেলস্নাফতে হয়ে যেত।’
‘এখন কি করবে?’
‘বিপুকে না নিয়ে বাড়ি যাওয়া যাবে না।’
কোন সিদ্ধান্তেô আসতে পারল না ওরা। কিছুড়্গণ এলোমেলো ভাবল। তারপর বিপস্নবকে খুঁজতে যাওয়ার ব্যাপারে একমত হল।
এবার আর রিস্ড়্গ নিতে চাইল না। তাই গাছের দু’টো ডাল ভেঙে দু’জনের হাতে রাখল। জঙ্গল ছাড়িয়ে পোড়োবাড়ির সামনে আসতেই ওদের নজরে পড়ল জিনিসটা। একটা মানুষ, চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। মাথাটা একদিকে কাঁত করা।
চমকে উঠল ছেলেরা। মরে যায়নি তো। বিপস্নবকে চিনতে পেরেছে ওরা। ছুটলো সেদিকে।
নানান ভাবনা ভেবে চলেছে। কেউ মেরে ফেলে যায়নি তো! বেঁচে আছে তো বিপু ভাইয়া? না-কি জ্ঞান হারিয়েছে?
বিপস্নবের দু’পাশে হাঁটু মুড়ে বসল দু’জন। লাঠি দুটো রাখল পাশে। বিজন ওর নাকের কাছে হাত নিয়ে গেল। উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখ। চকচক করে উঠল চোখ জোড়া। আছে, বেঁচে আছে বিপু ভাইয়া!
তাড়াতাড়ি ওর জ্ঞান ফেরানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল।
বিজন বলল, ‘আলম, দেখবে একটু পানি কোথাও পাওয়া যায় কি না?’
জানে এখানে কোথাও পানির ব্যবস্থা নেই, আগেই দেখে গেছে- তারপরও ছুটল আলম। যে করেই হোক ওর জ্ঞান ফেরাতে হবে।
একটু পর নিরাশ হয়ে ফিরে এলো।
‘এখন কি হবে?’ চোখে চোখে জিজ্ঞাসা করল ওরা।
একটু আগের মুখের উজ্জ্বলতা এখন আর নেই। তদস্থলে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় মন ছেয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই তার ছাপ পড়েছে সমস্তô শরীরে।
নতুন করে ঘামতে শুরম্ন করেছে ওরা। কানের পাশ বেয়ে নোনা পানি নিচে নামছে। শার্ট ভিজে শরীরের সাথে সেটে গেছে। ভিজে জবজব করছে।
হঠাৎ একটা বুদ্ধি মাথায় খেলে গেল বিজনের। গা থেকে শার্ট খুলে নিল। বিপস্নবের চোখের উপর ধরে নিংড়ালো। কয়েক ফোঁটা পানি পড়ল ওর বন্ধ চোখের পাতার ওপর। গড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করার পথ খুঁজল। চোখের পাতা দু’টো নড়ে উঠল বিপস্নবের। ইশারায় আলমের শার্টটাও চাইল বিজন। কাজ হল। নোনা পানি চোখে যেতেই জ্ঞান ফিরে পেল বিপস্নব। ধীরে ধীরে চোখ মেলল। মুখের ওপর হাসিমুখে হুমড়ি খেয়ে পড়া অবস্থায় দুই সঙ্গীকে আবিষ্ড়্গার করল।
উঠে বসল বিপস্নব। সাহায্য করল অন্যরা।
‘কি হয়েছিল তোমার, বিপু?’ জিজ্ঞেস করল বিজন।
বিপস্নব সংড়্গেপে সব বলল। শেষে বলল, ‘কিন্তু আমি এখানে এলাম কি করে?’
‘সেটা পরে ভাবলেও চলবে। বলল আলম। ‘এখন তুমি কেমন অনুভব করছ তাই বল।’
‘ভালো।’
‘ভালো হলেই ভালো। এখন চলো বাসায়। আগে খাওয়া-দাওয়া, তারপর অন্য কিছু।’
‘হঁ্যা বিপু,’ বলল বিজন। ‘দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। তোমারও নিশ্চয়ই ড়্গিধে পেয়েছে?’
বিপস্নব বলল, ‘তাইতো বলি, মাথাটা এমন ঝিম মেরে রয়েছে কেন? চলো চলো, পেটের রাড়্গসটাকে আগে ঠাwৈ করি। তারপর অনেক কাজ বাকি রয়েছে।’
উঠে দাঁড়াল বিপস্নব।
মুখে হাসি ফুটেও আবার তা মিলিয়ে গেল আলমের। বিপস্নবের শেষের কথাটা ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভাবল, আমার জন্যেই সব হচ্ছে। আমার জন্যেই বিজন সব জানিয়েছে বিপু ভাইয়াকে। আর ও অমনি ছুটে এসেছে রহস্য উদ্ধার করতে। আমিও চাই ব্যাপারটার একটা সুরাহা হোক। কিন্তু----
আর ভাবতে পারল না আলম। ততড়্গনে অন্যরা রওনা দিয়েছে। ও-ও ওদের সাথে যোগ দিল।
যেতে যেতে ওদের কুকুরে তাড়া খাওয়ার কথা শোনালো বিজন।
অবাক হল বিপস্নব। কুকুর এলো কোত্থেকে এখানে? ওর চোখে তো লোক দু’টো ছাড়া আর কিছু পড়েনি। নাকি ওদের কথা শোনার জন্য উদ্গ্রীব ছিল বলে অন্য কোন দিকে নজর যায়নি? তাই হবে। তদন্তô করতে হবে। ওখানে আরও কি কি আছে তা জানতে হবে। জানতে হবে ওরা ওখানে কি করছে।
বারো·বিকেলে আলমদের স্ড়্গুলের হেড স্যার এলেন। এসেই জানতে চাইলেন আলম এ কয়দিন ধরে স্ড়্গুলে যাচ্ছে না কেন?
আলম সন্তেôাষজনক কোন জবাব দিতে পারল না। আর ক’দিন পর থেকে যাবে বলল।
হেড স্যার তাতেও সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তবে মেনে নিলেন।
আলম ও বিজন হেড স্যারের সাথে বিপস্নবের পরিচয় করিয়ে দিল।
কিছুড়্গণ কথাবার্তা চলার পর হেডস্যার বললেন, ‘আমার সন্দেহের কথা আমি পুলিশকে বলেছি।’ অন্যেরা অবাক হলেও কেউ কোন প্রশ্ন করল না। স্যারের মুখ থেকেই সব শুনতে চাইল।
স্যার বললেন, ‘নিপুণ যে সাইদুল সাহেবের খুনের সাথে জড়িত তা আমি বুঝেছি।’ কথাটা বিপস্নবের ব্রেনে প্রচণ্ডভাবে আলোড়ন তুলল। নিপুনের কথা ও একদম ভুলে গিয়েছিল। স্যার বলে চলেছেন, ‘---পুলিশও সব শুনে প্রায় নিশ্চিত। ওরা নিপুনের বাসায় গিয়েছিল, পায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে সে নিখোঁজ। তার মা ছাড়া তো আর কেউ নেই। তিনিও কিছু বলতে পারেন না। খুবই ভেঙে পড়েছেন তিনি। কেঁদে-কেটে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে সাইদুল সাহেবের খুনের পেছনে নিজের ছেলে আছে জেনে অত্যন্তô মর্মাহত হয়েছেন। এখন তার দূর সম্পর্কের এক ছোট বোন তার সাথে রয়েছে।’
ফুঁপিয়ে উঠল নাদিরা।
স্যার তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তôনা দিলেন। নাদিরাও তার ছাত্রী ছিল। বললেন, ‘আবার কান্না কেন? তোমার আব্বু নেই তাতে কি, আমরা তো আছি।’ কথাটা নিজের কানেও কেমন বেখাপ্পা শোনালো স্যারের। এছাড়া তার কিছু বলারও নেই। বললেন আবার, ‘বর্তমানে দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার আমার খুবই পরিচিত। ও ঠিকই তোমার বাবার খুনিকে ধরে ফেলবে।’
‘কিন্তু আব্বুকে তো আর ফিরে পাব না, স্যার!’ ভেজা কণ্ঠে বলল নাদিরা ইয়াসমিন।
স্যার একথার কোন জবাব দিতে পারলেন না। তারও চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। চশমার কাচ মোছার চলে পাঞ্জাবির কোনা দিয়ে চোখও মুছে নিলেন। উঠতে উঠতে বললেন, ‘দেখি প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকাটা দ্রম্নত উঠানোর ব্যবস্থা আমি করে দেবখন। আর পেনশনের টাকাটা যাতে মার না যায় তার জন্যেও একটু তদবির করতে হবে। ---আসি মা। ভালো থেক। রাহাতের যত্ন নিও।’ তারপর ছেলেদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা একটু আমার সাথে এসো।’
বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে যেয়ে নির্জন মত এক জায়গায় থামল ওরা। স্যার বললেন, ‘কথাটা আমি বাড়িতেও বলতে পারতাম। কিন্তু নাদিরাকে শোনাতে চাইনি বলে এখানে নিয়ে এলাম। শোনো, ছেলেবেলায় আমিও প্রচণ্ডরকম অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্য প্রিয় ছিলাম। এই খুনটার পেছনে আমি একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। আমার রক্তের মধ্যে শিহরণ জাগছে---’
বিপস্নব স্যারের কথা থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি স্যার, কি ধরনের সন্দেহ করছেন?’
‘না, আমি কোন সন্দেহ করছিনে। আগেই বলেছি একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। শোনো ছেলেরা, স্ড়্গুলে একটা ঘটনা ঘটেছে আজ। আমার পিয়নকে পাঠিয়েছিলাম সাইদুল সাহেবের পারসোনাল ড্রয়ারটার তালা ভেঙে নতুন তালা লাগানোর জন্য। কিন্তু ও যেয়ে দেখে পূর্বেই কেউ ড্রয়ারটা ভেঙে ভেতরের জিনিসপত্র এলোমেলো করেছে।’
এটা সত্যিই ছেলেদের জন্য একটা ঘটনা।
বিজন বলল, ‘পুলিশকে জানিয়েছেন স্যার?’
‘না, এখনো জানায়নি।---এক কাজ কর, তোমরা কাল একবার স্ড়্গুলে এসো। তখন বিস্তôারিত আলোচনা করা যাবেখন।’ হঠাৎ গম্্ভীর হয়ে উঠল হেড স্যারের মুখ। ‘শোনো ছেলেরা, সাইদুল সাহেব ছিলেন আমার সবচয়ে ভালো সহকারী। স্ড়্গুলের যা কিছু উন্নতি, যা কিছু অর্জন-সব তার মাধ্যমেই সম্্ভব হয়েছে। তার খুনিকে আমি অত সহজে ছাড়ব না?’ তারপর আবার ওদেরকে কাল স্ড়্গুলে যাবার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে হাসি মুখে বিদায় নিলেন।
ছেলেরা তুণি বাড়ি ফিরল না। নিপুনের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলল বিপস্নবের কথা মত।
নিপুনের বাড়ির যাওয়ার পথে পাশের পাড়ায় একটা খেলার মাঠ পড়ে। মাঠে ক্রিকেট খেলছিল ছেলেরা। ওদেরকে দেখে এসে ঘিরে ধরল খেলা বাদ দিয়ে। মেহমানসহ সবাইকে খেলার আমন্ত্রণ জানালো। আসলে সবাই বিপস্নবের বেশ ভক্ত হয়ে উঠেছে বিজনের কাছে ওর গল্প শুনে।
বিপস্নব পরে একদিন খেলবে কথা দেয়ার পর রেহায় পেল।
মাটির ছোট একটি ঘর ও একটি রান্না ঘর নিয়ে নিপুনদের বাড়িটা। সামনে ছোট্ট একটা কলাবাগান। কলাবাগানের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করল তিন কিশোর। একমাত্র ঘরের বারান্দায় বেদে পাটি (খেজুর পাতার তৈরি)-তে বসে রয়েছে তিনটি মানুষ-দুইজন মহিলা ও একজন পুরম্নষ। মহিলা দু’জন নিপুনের মা ও তার বোন হবেন আন্দাজ করল বিপস্নব। পুরম্নষটা কে তা কেউ বলতে পারল না।
ওরা প্রবেশ করে সালাম দিল। তারপর নিজেদের পরিচয় দিল। বিজন ও আলম এর আগেও বেশ কয়েকবার এলেও ওদের চিনতে পারলেন না মা। তিনি চোখে ভালো দেখেন না।
ওদেরকে ঢুকতে দেখেই পুরম্নষটির মধ্যে কেমন চঞ্চলভাব দেখা দিল। মাথার চুলগুলো এলোমেলো। চোখে কালো মোটা পস্নাস্টিকের ফ্রেমের চশমা, একটা ডান্টি আবার ভাঙা, সুতো দিয়ে মাথার পেছন ঘুরিয়ে অপর ডান্টির সাথে বাঁধা। বাম গালে বড় এক আঁচিল। সমস্তô মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। গায়ে ময়লা একটা সাদা শার্ট। তার নিচের লাল গেঞ্জিটা ততোধিক ময়লা। শার্টের বুকের দু’টো বোতাম খোলা থাকায় সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পরনে কয়েক জায়গায় ফুটোঅলা ফুলপ্যান্ট। পায়ে গোড়ালি ড়্গয়ে যাওয়া একটা স্পঞ্জের স্যান্ডেল।
‘খালা, আমি তাহলে উঠি।’ বলে উঠে দাঁড়াল লোকটা। পাশেই কাঠের ক্র্যাচ ছিল। উঠিয়ে নিয়ে হাটা ধরল। যেন পালাতে পারলে বাঁচে।
লোকটার কথা শুনে আলম যেন একটু চমকে উঠল। কি যেন মনে আসি আসি করেও এলো না। লোকটার চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল তিন জোড়া চোখ।
আলমের ভ্রূ জোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে। দু’ঠোঁট ঈষৎ ফাঁক।
কলাবাগানের ওপাশে অদৃশ্য হবার আগে একবার থামল লোকটা। এদিকে তাকাল। তারপর দ্রম্নত অদৃশ্য হয়ে গেল।
‘ও আমার নিপুনের বন্ধু।’ ছেলেরা পাটিতে বসতেই বললেন মা। ‘নিপুনের নিখোঁজ হবার কথা শুনে এসেছে। বলছে, নিপুন ওর কাছে কিছু টাকা পেত। এক সাথে তো সব দিতে পারবে না, তাই আজ কিছু দিয়ে গেল। বাকি টাকা ম্যানেজ করে পরে আবার আসবে।’ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। ছেলেরা কোন কথা বলতে পারল না। বুঝল নিপুন বাড়িতে কোন যোগাযোগ করেনি।
মা আবার বললেন, ‘কাল পুলিশ এসেছিল, নিপুনরে খুঁজতে। বলেছে আবার আসবে। আচ্ছা বাবারা, তোমরাই কও, ও কেন ওর স্যারকে খুন করবে? নিশ্চয়ই কোন ষড়যন্ত্র।’
‘আচ্ছা চাচী,’ হঠাৎ মুখ খুলল বিপস্নব। ‘ইদানীং নিপুনের কোন পরিবর্তন আপনি লড়্গ্য করেছিলেন?’
‘লড়্গ্য করব না ক্যান? ছেলেটা আমার দেখতে দেখতে কেমন ধাঙর হয়ে গেল। মোছও উঠল অল্প অল্প।’
যেন মেঘের আড়াল থেকে সূর্যটা বেরিয়েই আবার ঢেকে গেল সূর্যটা, এমন অবস্থা হল ছেলেদের। আর কোন কথা জিজ্ঞেস করা অনর্থক ভেবে উঠে দাঁড়াল।
মা বললেন আলমকে, ‘আলম না আলমগীর কি যেন তোমার নাম, তোমার বাবাই খুব শরীফ মানুষ ছিল। মানুষটারে কিডা যে মারল!’
চলে এলো ওরা। সূর্যটা তখন পাটে যেতে বসেছে। পাখিরা কিচিরমিচির রব তুলে ফিরে চলেছে নীড়ে।
ভেকুটিয়া গ্রামটা পুনরায় নতুন একটা রাতের পেটে ঢোকার প্রস্তুতি নিল।
তের·আজ রাতে ‘ভয়াল রাতের হাতছানি’তে সাড়া দেয়ার সিদ্ধান্তô নিল ওরা।
তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে আলমদের বাড়ি মিলিত হল বিপস্নব এবং বিজন। বসল গিয়ে উঠানের পেয়ারা গাছের তলায়, খেঁজুর পাতার মাদুর পেতে।
নাদিরা ইয়াসমিন রাহাতকে নিয়ে শুয়ে পড়েছে।
অপেড়্গা করে রইল ছেলেরা, কান খাড়া করে।
ওদের অনুরোধে, বিশেষ করে আলমের, বিপস্নব তার অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী শুরম্ন করল। নিঝুম রাত। ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা বিরক্তিকর ডাক আর মাঝে মাঝে শিয়াল ও রাত জাগা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। আর আছে বিপস্নবের গল্প বলার শব্দ।
আজ পূর্ণিমা না হলেও মোটামুটি চাঁদের আলো আছে।
গল্প বলে চলেছে বিপস্নব। তন্ময় হয়ে শুনছে আলম ও বিজন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছে। বিপস্নব জবাব দিয়ে আবার শুরম্ন করছে।
হঠাৎ উৎকর্ণ হয়ে উঠল আলম। মনোযোগ ছিন্ন হল গল্প শোনা থেকে। কান পেতে শুনল। লড়্গ্য করল বিপস্নব। গল্প বলা থামিয়ে দিল। কান পাতল ও-ও। বিজনও শুনল।
‘আ----য়---!----আ---য়!!’
একই সাথে উঠে দাঁড়াল তিনজনে।
রাতের নিস্তôব্ধতাকে যেন খান খান করে দিল ওই ডাক। কেমন একটা মাদকতা আছে ডাকের মধ্যে। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল ওদের। এগিয়ে চলল তিন দিকে ভাগ হয়ে।
আলম সোজা চলেছে। বিপস্নব ডানে ও বিজন বাঁয়ে।
কয়েকটা বাড়ি-ঘর সংলগ্ন ছোটখাট বাগান অতিক্রম করে এগিয়ে চলল বিপস্নব।
এখনও মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট বিরতিতে শোনা যাচ্ছে ওই ডাক। যেন অদৃশ্য কোন আকর্ষণে এগিয়ে চলেছে তিনজন কিশোর।
গায়ে ঠাwৈ বাতাস লাগতে এবং সামনে খোলা জায়গা দেখে বুঝল বিপস্নব নদীর পাড়ে চলে এসেছে। নদীর ওপারে গাছগুলোর উপরে ঝুলে আছে স্নিগ্ধ চাঁদটা।
ডাক থেমে গেছে।
দাঁড়িয়ে পড়ল বিপস্নব। হঠাৎ ওর চোখে-মুখে একটা আলো এসে পড়ল। ওর হাতেও একটা টর্চ আছে। কিন্তু জ্বালানোর সুযোগ পেল না। হাত দিয়ে আলো থেকে চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করল। ওর বাঁ পাশে এসে দাঁড়াল দু’টো মূর্তি- আলম ও বিজন।
আলোটা এবার পালাক্রমে তিনজনের উপর পড়তে লাগল। কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে আসছে।
বিপস্নব খেয়াল করল একটা মোটরের শব্দ ক্রমশ মিলিয়ে গেল।
একটু দূরে থাকতেই টর্চ নিভিয়ে ফেলল লোকটা। এগিয়ে এসে ছেলেদের বিস্মিত চোখের সামনে দাঁড়াল।
‘স্যার, আপনি?’ অস্ফুটে বলে উঠল বিজন।
হেড স্যার সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, ‘আমি জানতাম তোমরাও আসবে। তো, কিছু চোখে পড়েছে তোমাদের?’
‘না স্যার।’ বলল বিজন।
বিপস্নব বলল, ‘একটা বোটের ইঞ্জিনের শব্দ যেন শুনছিলাম। হঠাৎ মিলিয়ে গেল---’
স্যার বললেন, ‘হঁ্যা, ঠিকই শুনেছ। নদীতে একটা ইঞ্জিনঅলা নৌকা ছিল। চলে গেছে।’ ছেলেদের অবাক ভাব তখনও কাটছে না দেখে আবার বললেন, ‘আমাকে এই সময় এখানে দেখে তোমরা অবাক হচ্ছো, কেমন! কাল তো তোমরা আসছো স্ড়্গুলে, তখন কথা হবেখন। আর তোমরা তো জেনেইছ আমি একটু রহস্যপ্রিয়।’ আর কিছু না বলে, কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, ওদেরকে ঘোরের মধ্যে রেখে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন আলমদের হেড স্যার। তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল তিনজোড়া চোখ। দেখল, একটা ছায়ামূর্তি আড়াল থেকে বেরিয়ে তার সাথে যোগ দিল। তারপর মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
বাস্তôবে ফিরে এলো ছেলেরা।
বিজন স্বগোতক্তি করল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার!’
বিপস্নব ধরল কথাটা। জিজ্ঞেস করল, ‘কী?’
‘ভাবছি, হেড স্যার এত রাতে এখানে কী করছিলেন, তাও এই সময়?’ বলল বিজন।
‘হেড স্যার এসবের পেছনে জড়িত নন তো?’ সন্দেহ দেখা দিল আলমের কণ্ঠে।
‘সেটা কাল স্ড়্গুলে গিয়েই জানা যাবে।’ বলল বিপস্নব।
আরও কিছুড়্গণ থাকলো ওরা ওখানে। আশপাশে টর্চের আলো ফেলে খোঁজাখুঁজি করল।
মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছে চাঁদ। আলো-আঁধারীর এই খেলা উপভোগ করছে ছেলেরা। নদীর পানিতে স্থির ছায়া। ঝিরি ঝিরি ঠাwৈ বাতাস। চমৎকার লাগছে। শরীর জুড়িয়ে আসছে। রাত গভীর হচ্ছে দেখে এক সময় ফিরে চলল ওরা।
সে রাতে আর কিছু ঘটল না।
বিজনের বাড়িতে বলা ছিল। আলমের রম্নমে একসাথে শুলো ওরা।
গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। উঠল ফজরের আগে। মসজিদে নামাজ পড়ে একটু হাঁটতে বের হল। হাটতে হাটতে ওরা নদীর ধারে চলে এসেছিল। জগিং করার স্টাইলে দৌড়াচ্ছিল নদীর তীর দরে।
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল বিপস্নব। কিছু একটা চোখে পড়েছে ওর।
অন্যরা ওর থেকে একটু এগিয়ে গিয়েছিল। ডাকল বিপস্নব, ‘এ্যাই, দেখে যাও একটা জিনিস।’ দৌড় থামিয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়াল অন্য দু’জন। জানতে চাইল, ‘কী?’
নদীর অপর পাড়ে হাত তুলে দেখাল বিপস্নব।
‘হঁ্যা, ওটা একটা ইটের ভাটা ছিল।’ উচ্চ চিমনিটা দেখে বলল আলম।
বিপস্নব বলল, ‘তার মানে এখন ওটা বন্ধ। কিন্তু---’ একটু ভাবল। তারপর আবার বলল, ‘তাই-ই হবে।’
বিজন বলল, ‘ব্যাপার কি খুলে বল তো? হঠাৎ ইটের ভাটা নিয়ে এতো উৎসাহী হয়ে উঠলে কেন?’
‘না, কিছু না।’ জবাব দিল বিপস্নব। ‘ভাবছি, একটা নৌকা পেলে ওপার থেকে ঘুরে আসা যেত।’
‘তা মন্দ বলনি।’ বলল বিজন। ‘গত দু’দিনে শরীরের উপর দিয়ে ধকল তো আর কম যায়নি। একটু রিল্যাঙ্রেও প্রয়োজন আছে। কি বলো?’ সমর্থনের আশায় অন্যদের দিকে তাকাল ও।
আলম বলল, ‘তোমরা এখানে একটু দাঁড়াও। আমি দেখি ঝন্টুকে বাড়ি পাওয়া যায় কিনা।’
বলেই দৌড় দিল। ফিরে এলো একটু পরেই। সঙ্গে ওদেরই বয়সী একটা ছেলে। হাতে বৈঠা। বিপস্নব বুঝল, এরই নাম ঝন্টু।
সংড়্গিপ্ত পরিচয় পর্বটা শেষ হল। বিপস্নবের সাথে পরিচিত হতে পেরে খুবই খুশি হল ঝন্টু। সে কথা জানিয়েও দিল।
ডিঙি নৌকাটা তীরেই বাঁধা ছিল। একটু পরেই সেটাকে দেখা গেল মুক্তেশ্বরী নদীর পানিতে। আর আশ্চর্যের বিষয়, দাড় বাইছে বিপস্নব স্বয়ং। ঝন্টু তো ওর পারফরম্যান্স বেজায় খুশি। চমৎকার চালাচ্ছে বিপু ভাইয়া।
ও’তীরে নৌকা বেঁধে উপরে উঠে চলল চারজনের দলটা।
এখানে ওখানে ভাঙা ইটের স্তôূপ আর গর্ত দেখা গেল। তার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল চিমনিটা। ওটার গোড়ায় এসে নাক বরাবর উপরে তাকাল ওরা। মাথা ঘুরে উঠল।
এদিক-ওদিক তীî নজরে দেখল বিপস্নব। চোখ জোড়া চকচক করে উঠল ওর। কি একটা যেন বাঁধা রয়েছে ওর মাথায়। ফাড লাইটের একটা হোল্ডার। একটা তার ওখান থেকে চিমনির গা পেঁচিয়ে নিচে নেমে এসেছে। সেটাকে অনুসরণ করে নিচে নেমে এলো দৃষ্টি। গোড়ায় একটা গর্তের দিকে চলে গেছে। এগিয়ে চলল সেদিকে। একটা মাল্টিপস্নাগের পাশে একটা পস্নাগ। চিমনি থেকে নেমে আসা তারের মাথায় পড়ে আছে। মাল্টিপস্নাগের উৎস খুঁজতে গিয়ে মাটিতে চৌকোণা আয়তকার একটা ছাপ পেল দেখতে। নিশ্চয়ই কোন ব্যাটারী রাখা হয় এখানে। অনুমান করল। মাল্টিপস্নাগের তারের মাথায় দু’টো কাইচি পস্নাগও দেখল।
মুহূর্তে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল ওর কাছে। সার্চ লাইটের উৎস তাহলে এই।
‘এ্যাই! ওই যে নিপুন!’ হঠাৎ বলে উঠল আলম।
ঝট করে সেদিকে তাকাল বিপস্নব। ‘কই? কোথায়?’
আলম ততড়্গণে ছুটতে শুরম্ন করেছে। ওর পিছে ছুটল অন্যরাও।
একটা ভাঙা ইটের স্তুপের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল আলম। অন্যরাও। হাঁফাচ্ছে।
‘কোথায় নিপুন? ঠিক দেখেছিলে তো?’ প্রশ্ন বিজনের।
‘ওকেই তো দেখলাম মনে হল।’ কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ পেল আলমের গলায়। ‘এই এখানে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে দেখছিল!’
‘তোমার চোখের ভুল না তো?’
বিপস্নব কি যেন খুঁজছে। হঠাৎ নিচু হয়ে মাটি থেকে কি একটা কুড়িয়ে নিল। বলল, ‘না, চোখের ভুল না। আলম নিপুনকেই দেখেছে।’
ওদের সবার দৃষ্টি তখন বিপস্নবের হাতের জিনিসটার উপর।
বিপস্নব বলল, ‘ও যে এখানে ছিল তার প্রমাণ এই চিঠিটা।’ তারপর শব্দ করে পড়ল, ‘বিপস্নব খান ওরফে বিপু ভাইয়া, হঁ্যা, তোমাকেই ছিল। তোমার পরিচয় আমি জেনে ফেলেছি। কিন্তু আমি চাই তুমি আজই এবং এুনি বাড়ি চলে যাও। আশা করি আমার ভাষা তুমি বুঝতে পারছ। আর হঁ্যা, আমি এক ভাষা কাউকে দুইবার বলি না। সি·এম· আজিম।’
একটু চিন্তôার ভাব ফুটবল বিপস্নবের চোখেমুখে। তারপর উজ্জ্বল একটা হাসি ওর পুরো চেহারাটায় ছড়িয়ে পড়ল। ভাবল, যাক, একটা বিষয়ে পরিষ্ড়্গার হয়ে গেল। নিপুন তাহলে চৌধুরী মোঃ আজিমের হয়ে কাজ করছে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য এখনও অস্পষ্ট। সে কথা অন্যদের জানালো ও।
আলম বলল, ‘তুমি তাহলে চলেই যাও।’
বিজন বলল, ‘এটা একটা স্পষ্ট হুমকি। আসলে---’
ঝন্টু বলল, ‘ভারি ইন্টারেস্টিং! এই, আমাকে নেবে তোমাদের সাথে?’
বিপস্নব এ সব কথার কোনই জবাব দিল না। ভাবছে। হঠাৎ বলল, ‘চলো, ফেরা যাক এবার।’
বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে তুমি আজই চলে যাচ্ছ?’
মুচকি হাসল বিপস্নব। তারপর গম্্ভীর হয়ে উঠল? ওর এই চেহারা আগে কখনও দেখা যায়নি। চোয়াল জোড়া শক্ত করে বলল, ‘না, আমি যাচ্ছিনে, অন্তôত এর শেষ না দেখে।’
কিছুটা স্বস্তিô পেল বিজন ও আলম।
বিজন বলল, ‘তাহলে চলো, পুলিশকে গিয়ে সব খুলে বলি।’
‘না।’ বলল বিপস্নব। ‘এই মুহূর্তে পুলিশ কেন, অন্য কাউকেই জানানো যাবে না আমরা চৌধুরী মোঃ আজিমকে সন্দেহ করছি। আমি যতড়্গণ না বলব, তোমাদের কথা দিতে হবে ততড়্গণ কাউকে এ ব্যাপারে একটি কথাও বলবে না।’
বিজন বলল, ‘বেশ কথা দিলাম।’
ঝন্টু বলল, ‘এখন থেকে আমিও তাহলে তোমাদের একজন, কি বল?’
ওর বলার ধরণে হেসে উঠল সবাই।
একটু পর নৌকাটা আবার মুক্তেশ্বরীর বুকে ভেসে চলল।
চোদ্দ·ছবিটা দেখে একটু যেন চমকে উঠল আলম। বিপস্নবের অন্তôত তাই মনে হল।
‘এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন, স্যার।’ অবাক হয়ে জানতে চাইল আলম।
হেড স্যার বললেন, ‘আন্দাজ কর।’ তারপর রহস্যময়ভাবে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।
ছেলেরা বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে স্ড়্গুলে এসেছে। ঝন্টুকেও আসতে বলেছিল ওরা। কিন্তু তার জরম্নরি কাজ থাকায় আসতে পারেনি।
অন্য সব শিড়্গক ক্লাসে চলে গেছেন। প্রধান শিড়্গকের রূমে এখন ওরা চারজন। কিছু কথাবার্তার পর আলমের এক প্রশ্নের জবাবে ছবিটা বের করে দিয়েছেন হেড স্যার। আর সেটা দেখেই এই অনুভূতি আলমের।
বিপস্নব বলল, ‘বুঝলাম স্যার আপনি ছবির লোকটার কথা মত গত রাতে নদীর ওদিকে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমার কাছে একটা বিষয় পরিষ্ড়্গার হচ্ছে না। লোকটা আসলে কি চায়?’ কথা বলতে বলতেই আলমের হাত থেকে ছবিটা নিয়েছিল ও। আর ছবিটা চোখের সামনে ধরতেই ভীষণভাবে যেন নাড়া খেল। বলল, ‘আরে, এর সাথে তো আমার কথা হয়েছে!’
হেড স্যার হাসি থামিয়ে গম্্ভীর হলেন। বললেন, ‘জানি। তিনি আমাকে বলেছেন।’
ছবিটা আরেকবার করে দেখে স্যারকে ফেরত দিল ওরা।
বিপস্নব বলল, ‘শেষ কবে তার সাথে দেখা হয়েছে আপনার?’
স্যার বললেন, সে কথা এড়িয়ে গিয়ে, ‘তিন-চার বার তার সাথে কথা হয়েছে।’
বিপস্নব কি ভাবছিল। হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘স্যার, আপনার লুকানো বিষয়টা কিন্তু···’
স্যার ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘সেটা না হয় সন্ধ্যার সময়ই জানলে।’


